৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১৬ই শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

বেরোবির হাতে পীরগঞ্জ আইটি সেন্টার: উত্তরাঞ্চলের প্রযুক্তি-ভবিষ্যৎ কি এবার ঘুম ভাঙবে?

admin
প্রকাশিত ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫, ০৭:৪০ অপরাহ্ণ
বেরোবির হাতে পীরগঞ্জ আইটি সেন্টার: উত্তরাঞ্চলের প্রযুক্তি-ভবিষ্যৎ কি এবার ঘুম ভাঙবে?

Manual4 Ad Code

নিউজ ডেস্ক, রংপুর

Manual8 Ad Code

পীরগঞ্জের দুপুরটা সেদিন ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তির—কুয়াশা আর রোদের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা এক নির্লিপ্ত বিকেল। কিন্তু সেই স্থিরতার ভেতরেই যেন লুকিয়ে ছিল উত্তরের প্রযুক্তি-ভবিষ্যতের নতুন অধ্যায়। পীরগঞ্জ আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টারের গেটে ঢুকতেই মনে হলো—শীতের হিমেল বাতাসের মতো ধীরে ধীরে বদলের হাওয়া।

বহু বছর ধরে বন্ধ দরজাগুলো যেন অপেক্ষা করছিল ঠিক এই দিনের জন্য। হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি দল যখন সেন্টারটি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. মো. হারুন-অর-রশিদের হাতে হস্তান্তর করলেন, তখন দৃশ্যটি ছিল নিঃশব্দ অথচ নাটকীয়; যেন শান্ত নদীর বুক চিরে উঠে আসা এক লুকানো স্রোত। যেন কেউ বলছে-‘এ গল্প এখানেই শেষ নয়, আসল শুরু এখন।’

একটি ফাইল, কয়েকটি স্বাক্ষর, আর কিছু আনুষ্ঠানিক হাসি—সব মিলিয়ে এটি হয়তো এক সাধারণ সরকারি আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু পীরগঞ্জের মানুষদের জন্য এটি ছিল বহু বছরের প্রত্যাশার ফল, আর বেরোবির জন্য দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত এক ধরনের নৈতিক দায়— যে দায় উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থী, তরুণ প্রযুক্তিবিদ আর উদ্যোক্তাদের ভবিষ্যতের প্রতি।

প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান, বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক কমলেশ চন্দ্র রায়— উপস্থিতির তালিকাটি যতই আনুষ্ঠানিক হোক, চোখের ভাঁজে তাদের প্রত্যাশা ছিল স্পষ্ট।

Manual2 Ad Code

সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, তারা যেমন সেন্টারের চাবিটি গ্রহণ করছেন, তেমনই গ্রহণ করছেন একটি অঞ্চলের স্বপ্ন, একটি সময়ের দাবি, আর সবচেয়ে বড় কথা—উত্তরাঞ্চলের অবহেলার ইতিহাস বদলে দেওয়ার এক সুযোগ। সেন্টারের ভেতর ঢুকে মনে হয়—এ যেন উত্তরবঙ্গের ঘুম ভাঙানোর যন্ত্রঘর।

দুই তলা ভবন, কাঁচের সামনে আলো ছড়িয়ে পড়ছে, খোলা জায়গায় বসে আছে অনাবিষ্কৃত সম্ভাবনার স্তূপ। তবুও ভবনটির ওয়ালে যেন এখনও লেগে আছে সৃষ্টির অর্ধেক গল্প—যেন দীর্ঘ অপেক্ষা, অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি আর থেমে থাকা প্রকল্পের গন্ধ।

এই ভবনের ভেতরে ঢুকলেই প্রশ্ন তাড়া করে: এতদিন কেন? কে থামিয়ে রেখেছিল সময়কে? কে গড়েছিল এই নীরবতা?

সেন্টারটি বেরোবির হাতে গেলে কী ঘটতে পারে? তরুণরা পাবে প্রশিক্ষণ, কোডিং থেকে স্টার্টআপ— সবই। উদ্যোক্তারা উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করতে পারবেন। সৃষ্টি হবে স্থানীয় কর্মসংস্থান। প্রযুক্তিখাতের দক্ষ মানবসম্পদ বাড়বে। এ যেন মরুভূমিতে প্রথম বৃষ্টির গন্ধ—ভবিষ্যৎকে চাষাবাদ করার সুযোগ।

Manual3 Ad Code

কিন্তু প্রশ্নও কম নয়—বিশ্ববিদ্যালয় কি এই বিশাল দায়িত্ব সামলানোর প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে? নাকি এটি হবে আরেকটি “ফাইলবন্দি উন্নয়ন”—কাগজে স্বপ্ন, বাস্তবে নীরবতা?

Manual2 Ad Code

বলতে গেলে—’প্রকল্প যতটা প্রযুক্তির, ঠিক ততটাই জবাবদিহির।’
পীরগঞ্জের রাস্তায় ঘুরে শোনা যায় অন্যরকম কথাবার্তা ‘বছর বছর শুনি আইটি সেন্টার হবে। এবার কি সত্যিই কিছু হবে?’ ‘

আমাদের ছেলেমেয়েরা কি এবার বাইরে না গিয়ে এখানেই শিখতে পারবে?
এমন প্রশ্নে লুকিয়ে আছে হতাশার অতীত, আবার সম্ভাবনার বর্তমানও। চাকরি, প্রশিক্ষণ, স্টার্টআপ—এই সব শব্দ এখানে বহুদিন ধরেই শুধু পোস্টারে থাকে, বাস্তবে নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব এখন শুধু ভবন চালানো নয়;
বরং সম্পূর্ণ একটি প্রযুক্তিনির্ভর ইকোসিস্টেম তৈরি করা। এটি ঘোড়ার সামনে গাড়ি নয়—এটি পুরো ঘোড়াকেই দৌড়ানোর চ্যালেঞ্জ।
তাদের সামনে আছে—দক্ষ জনবল গঠন, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের সুযোগ, গবেষণা সুবিধা, উদ্যোক্তা বিকাশের পরিবেশ, বাইরের তহবিল সংগ্রহ, দীর্ঘমেয়াদি একটি নীলনকশা।
প্রশ্ন রয়ে যায়—বেরোবি কি উত্তরাঞ্চলের এই স্লিপিং জায়ান্টকে জাগাতে পারবে? হস্তান্তর অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তে যখন সবাই নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল গল্পের পর্দা নামছে, অথচ প্রকৃত কাহিনি এখনই শুরু। প্রতিবেদকের চোখে সেই দৃশ্যটি ছিল যেন—শীতের দুপুরে জেগে ওঠা কাঁচে ঘেরা একটি বাড়ি, যার ভেতরে কেউ বাতি জ্বালিয়ে বলছে: ‘আলোটা তো অনেকদিন ধরেই নিভে ছিল, এবার তা জ্বলে থাকুক দীর্ঘদিন।’
শেষ প্রশ্নটি এমন হতে পারত— ‘উত্তরবঙ্গের ভবিষ্যৎ যদি সত্যিই বদলাতে হয়, তবে এই সেন্টারের দরজা শুধু খোলা হলেই হবে না—সেখান থেকে আলো বেরোতে হবে, মানুষের ঘরে পৌঁছাতে হবে।’
সেই আলো কবে পৌঁছাবে? এখনই বলা কঠিন। তবে ইতিহাস বলে—যেকোনো বড় গল্পের শুরুটা ঠিক এমনই নীরব হয়। নীরব, কিন্তু প্রয়োজনীয়।

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code