৩১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৪ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

অধিকার না ব্যবসা? ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের অন্ধকার অর্থনীতি

editor
প্রকাশিত এপ্রিল ১৩, ২০২৬, ০৭:১২ অপরাহ্ণ
অধিকার না ব্যবসা? ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের অন্ধকার অর্থনীতি

Manual4 Ad Code

অধিকার না ব্যবসা? ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের অন্ধকার অর্থনীতি

 

Manual2 Ad Code

লোকমান ফারুকঃ ৭ এপ্রিলের একটি চিঠি ঢাকার দিকে রওনা হয়। প্রেরক –একজন স্থানীয় ট্রেড ইউনিয়ন নেতা। ভাষা সংযত, অভিযোগ কঠিন। চিঠিটি তৃতীয়বারের মতো পাঠানো। তার মানে, এর আগে আরও দুটি অভিযোগ ছিল–অপ্রাপ্ত বা অগ্রাহ্য। চিঠির ভেতরে যে কথাগুলো আছে, সেগুলো কাগজে শুকনো। মাঠে সেগুলো ভিজে–ঘাম, অনিশ্চয়তা আর সন্দেহের।

Manual8 Ad Code

নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলা বাজারে সকাল শুরু হয় ট্রাকের শব্দে। চাল, সার, পাথর, ইট–সবই ওঠানামা হয় মানুষের মাধ্যমে। এই কাজের জন্যই লোড-আনলোড শ্রমিকদের ইউনিয়ন। কিন্তু এখন ইউনিয়নের সংখ্যা নিয়ে সমস্যা। উপজেলায় নিবন্ধিত ইউনিয়ন–১১টি। একজন পুরোনো শ্রমিক বললেন, “আগে তিনটা ছিল। এখন এতগুলো ইউনিয়ন, কিন্তু কাজ তো বাড়ে নাই। ভাগ হয়ে গেছে।” সংখ্যা বেড়েছে, কাজ বাড়েনি–কিন্তু ভাগ হয়েছে। এতে আয় কমেছে। প্রতিযোগিতা বেড়েছে। অদৃশ্য টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে–এই ইউনিয়নগুলোর অনেক সদস্য প্রকৃত শ্রমিক নন। তালিকা বড় করা হয়েছে কাগজে, নতুন-নতুন লোককে মাঠে নামানো হয়েছে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্য কিছু শর্ত আছে–উপজেলায় ট্রেড ইউনিয়নের নির্দিষ্ট সংখ্যা, নির্ধারিত সংখ্যক প্রকৃত শ্রমিক, তাদের স্বাক্ষর, কার্যক্রমের বাস্তবতা। কিন্তু অভিযোগ বলছে–এই শর্তগুলো পাশ কাটিয়ে নিবন্ধন হয়েছে। একজন স্থানীয় সংগঠক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তালিকায় যাদের নাম আছে, অনেককে আমি চিনি না। আবার যারা কাজ করে, তাদের নামই নাই।”
চিঠিতে উল্লেখ আছে–শ্রমিক সংখ্যা কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়েছে। এটা শুধু সংখ্যা নয়–ক্ষমতার ভিত্তি। যত বড় ইউনিয়ন, তত বড় প্রভাব। এবং প্রভাব মানে—কাজের বণ্টন, চাঁদা, নিয়ন্ত্রণ।

সব অভিযোগের ভেতর একটি নির্দিষ্ট ঘটনা আলাদা হয়ে দাঁড়ায়। “জলঢাকা পৌরসভা লোড আনলোড লেবার ইউনিয়ন”–একটি নতুন নিবন্ধিত সংগঠন অভিযোগ–নিবন্ধনের জন্য ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে। স্থানীয়ভাবে এই কথা ‘প্রচারিত’–কিন্তু কাগজে নেই। তবে অভিযোগ আরও নির্দিষ্ট: একজন অফিস সহকারীর মাধ্যমে টাকা গেছে। ইউনিয়নের এক নেতা–মোঃ সাদিকুল ইসলাম ভাকু–নাকি নিজেই এই কথা বলেছেন, এমন দাবি চিঠিতে। এই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। কিন্তু প্রশ্নটি রয়ে যায়–নিবন্ধনের দরজা কি টাকার বিনিময়ে খুলছে? চিঠির ভাষায়–”স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক ব্যক্তি” এবং “অসৎ চক্র”। এই দুই শব্দের মাঝখানে থাকে বাস্তব সম্পর্ক। স্থানীয় পর্যায়ে ইউনিয়ন মানে শুধু শ্রমিক সংগঠন নয়। এটি রাজনৈতিক প্রভাবের একটি ক্ষেত্র।
একজন সাবেক ইউনিয়ন নেতা বলেন, “যে ইউনিয়ন নিয়ন্ত্রণ করবে, সে বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে। আর বাজার মানে টাকা।” অন্যদিকে, শ্রম অধিদপ্তরের আঞ্চলিক অফিস–যেখানে নিবন্ধন হয়। এই দুই স্তরের মধ্যে একটি অদৃশ্য সমন্বয় কাজ করে বলে অভিযোগ। কে কাকে প্রভাবিত করে, কে কাকে রক্ষা করে—এটা প্রমাণ করা কঠিন। কিন্তু ফলাফল দৃশ্যমান: অল্প সময়ে ১১টি ট্রেড ইউনিয়নের নিবন্ধন।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে–শ্রম আইনের কয়েকটি ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে। আইন বলে–ইউনিয়ন গঠনের উদ্দেশ্য শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা। বাস্তবে যা ঘটছে–একাধিক ইউনিয়ন, বিভক্ত শ্রমিক, কমে যাওয়া আয়, বাড়তি উত্তেজনা। একজন শ্রমিক বললেন, “আমরা কাজ করতে আসি। এখন এসে দেখতে হয়–আমি কোন ইউনিয়নের।” আইনের ভাষা নিরপেক্ষ। মাঠের বাস্তবতা–সংঘর্ষপূর্ণ।

Manual8 Ad Code

চিঠির শেষে তিনটি দাবি: বেআইনিভাবে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন দেওয়ার ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটি গঠন। প্রমাণিত হলে নিবন্ধন বাতিল। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা-এই দাবিগুলো নতুন নয়। কিন্তু এটি তৃতীয় আবেদন।
তার মানে—প্রতিক্রিয়া আসেনি, অথবা যথেষ্ট আসেনি।
এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে স্পষ্ট বিষয়–নীরবতা।
শ্রম অধিদপ্তর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া নেই। অভিযুক্তদের পক্ষ থেকেও প্রকাশ্য বক্তব্য নেই। কিন্তু নীরবতা কখনো কখনো নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে। জলঢাকা বাজারে বিকেলের দিকে ট্রাক কমে আসে। শ্রমিকরা বসে থাকে–কেউ কাজ পেয়েছে, কেউ পায়নি। একজন বৃদ্ধ শ্রমিক বললেন,
“ইউনিয়ন বাড়ছে, কিন্তু আমাদের পেট তো একই আছে।” এই কথার ভেতরেই পুরো গল্পটা ভেসে ওঠে।

Manual5 Ad Code

ট্রেড ইউনিয়ন যদি শ্রমিকের জন্য হয়–তাহলে শ্রমিক কেন বিভক্ত? যদি আইন সুরক্ষা দেয়–তাহলে অভিযোগ কেন তৃতীয়বার করতে হয়? আর যদি নিবন্ধন একটি অধিকার হয়–তাহলে সেটি কি কারও জন্য ব্যবসা হয়ে উঠেছে? কাগজের পথ দীর্ঘ হতে পারে। কিন্তু এই পথের শেষ কোথায়–সেটা এখনো অস্পষ্ট।

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code