২২শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ৩রা শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

আমার ছেলের হত্যাকারীদের ফাঁসি দেখতে চাই: আবু সাঈদের বাবা

admin
প্রকাশিত নভেম্বর ১৭, ২০২৫, ০৮:০৭ অপরাহ্ণ
আমার ছেলের হত্যাকারীদের ফাঁসি দেখতে চাই: আবু সাঈদের বাবা

Manual1 Ad Code

আমার ছেলের হত্যাকারীদের ফাঁসি দেখতে চাই: আবু সাঈদের বাবা

লোকমান ফারুক, রংপুর
ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার খবর পৌঁছাতেই রংপুরের সেই গ্রাম—যেখানে আবু সাঈদ-এর কবর। মানুষ যেখানে কিছুদিন আগেও, জনতার কণ্ঠরোধ দেখে আতঙ্কে ঘুমোত। সেখানে আজ এক ধরনের ভারী নীরবতা। বাড়ির উঠোনে বসে থাকা মকবুল হোসেন বারবার শুধু একটি কথাই বলছিলেন, “রায় হয়েছে, কিন্তু বিচার দেখতে চাই। আমার ছেলের হত্যাকারীদের ফাঁসি দেখতে চাই।”

Manual7 Ad Code

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর শহীদ আবু সাঈদের পরিবার এমন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

মকবুল হোসেন বলেন,”আমার ছেলে শহীদ হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশ তাকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করেছে।’ যারা গুলি করেছে, যারা হুকুম দিয়েছে—সবার বিচার চাই। ফাঁসি চাই।’ তার কথায় কোনো উত্তেজনা নেই—শুধু ভাঙা স্বর, বারবার স্তব্ধ হয়ে যাওয়া দীর্ঘশ্বাস। তিনি বলেন, “হাজার হাজার মানুষকে যেভাবে গুলি করা হলো—স্পষ্ট, অনুমতি ছিল সর্বোচ্চ মহল থেকে।’ অনেকে পঙ্গু, কারও চোখ নষ্ট, হাসপাতালে আজও কাতরাচ্ছে। এমন বিচার হওয়া দরকার, যাতে কেউ আর এমন সাহস না পায়।

মনোয়ারা বেগম, আবু সাঈদের মা, চোখ মুছতে মুছতে বলেন, “আমি ‘মা’ জানি ছেলে হারানোর যন্ত্রণা।’ শুধু আমার না—অনেক মা, অনেক বোন, অনেক পরিবার শেষ হয়ে গেছে। যারা হুকুম দিয়েছে, যারা ট্রিগার টেনেছে—সবাইকে ফাঁসি দিতে হবে।’
তার হাতের আঙুল শক্ত হয়ে আসে—যেন অদৃশ্য একটি শোকের ভার তিনি ধরে রেখেছেন।

Manual1 Ad Code

আবু সাঈদের বড় ভাই আবু হোসেন বলেন,
‘শেখ হাসিনা ও তার দোসররা দীর্ঘদিন ধরে গুম-খুন করেছে। জুলাই আন্দোলনের সময় যা করেছে, সেটা মানবতাবিরোধী অপরাধের চূড়ান্ত রূপ। শুধু রায় ঘোষণায় হবে না—কার্যকর করতে হবে।’
তার বক্তব্যে ক্ষোভের সঙ্গে সতর্কতার আভাসও ছিল—
‘বাংলার মাটিতে এনে বিচার না হলে শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে না।

Manual7 Ad Code

হত্যা মামলার বাদী ও বড়ভাই রমজান আলী বলেন,
“পুলিশ প্রকাশ্যেই গুলি করে হত্যা করেছে। ভিডিও ফুটেজ দেশ–বিদেশ সবাই দেখেছে। এটি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছিল বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানে যেসব পরিবার তাদের স্বজন হারিয়েছে—তাদের যন্ত্রণা কোনো ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। খুনিরা যেখানেই থাক—ধরে এনে ফাঁসি দিতে হবে।

আবু সাঈদের গ্রামে গিয়ে দেখা যায়—মানুষ দল বেঁধে রায় নিয়ে আলোচনা করছেন। স্থানীয় এক প্রবীণ শিক্ষক বলেন, ‘রায় দিয়েছে ভালো। কিন্তু কার্যকর না হলে সব বৃথা যাবে। গণহত্যার মতো অপরাধের বিচার প্রকাশ্যেই হওয়া উচিত।’ আরেকজন যুবক যোগ করেন,
‘রায় পর আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা এখনই নিশ্চিত করতে হবে। ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসন করা যাবে না।’

Manual3 Ad Code

সোমবার দুপুরে বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই মামলার রায় ঘোষণা করে। ট্রাইব্যুনালের অন্য সদস্য বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

মামলার তিন আসামির মধ্যে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল পলাতক। একমাত্র গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন আদালতে দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হন। তাঁর পাঁচ বছরের সাজার রায় হয়েছে।

মামলায় আন্দোলনকারী, প্রত্যক্ষদর্শী, আহত ব্যক্তি, চিকিৎসকসহ মোট ৫৪ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। নথিভুক্ত ভিডিও, ফরেনসিক রিপোর্ট, ডিজিটাল প্রমাণ এবং প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যে উঠে এসেছে—বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় কাছে থেকে গুলি করা হয়েছিল।
আবু সাঈদ ছিলেন ইংরেজি বিভাগের ১২ ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক।

রায় ঘোষণা হয়েছে, সন্তোষও এসেছে। কিন্তু বিচার কার্যকরের প্রশ্ন এখন প্রতিটি শহীদ পরিবারের মুখে:
‘যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে আড়ালে থেকে গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিল—তাদের দণ্ড কি বাংলার মানুষ দেখবে?’

মকবুল হোসেনের কণ্ঠে আরেকবার ভেসে আসে সেই কথাটি—”রায় দেখলাম। এখন রায় কার্যকর দেখতে চাই।”
১৭ নভেম্বর ২০২৫

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code