দিনাজপুরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণশুনানি: তরুণদের চোখে শুদ্ধতার আগুন।
লোকমান ফারুক : বিশেষ প্রতিনিধি।
দিনাজপুর শিশু একাডেমি অডিটোরিয়ামের ভেতর তখন দুপুরের আলো। ভিড়ের ভেতর কিশোর শিক্ষার্থীদের চোখে কৌতূহল, সরকারি কর্মচারীদের মুখে এক ধরনের সতর্কতা, আর সাধারণ মানুষের গলায় দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। টেবিলের ওপারে বসেছেন কর্মকর্তারা—দুর্নীতির অভিযোগ শুনতে। কেউ সরকারি জমি বেহাতের কথা বলছে, কেউ বলে স্কুলে ঘুষের খরচ। দিনাজপুর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আয়োজনে এমনই এক গণশুনানির আয়োজন হয়েছে সোমবার (১০ নভেম্বর)।
“দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারুণ্যের একতা, গড়বে আগামীর শুদ্ধতা”-এ স্লোগান ঝুলছে মঞ্চের পেছনে। মাইক্রোফোনে উঠে এলেন দুদকের কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী। কণ্ঠে দৃঢ়তা, কিন্তু চোখে ক্লান্ত আশাবাদ—’যেখানেই দুর্নীতি, সেখানেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে,’ বললেন তিনি। ‘জনগণের টাকায় যারা বেতন নেন, তাদের প্রথম কাজ জনগণকেই সেবা দেওয়া। রাজনৈতিক প্রভাব বা কোনো চাপের কাছে মাথা নত করা মানে রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্যায়।’
অডিটোরিয়ামের ভেতর নীরবতা নেমে এল। পাশে বসা এক শিক্ষক ফিসফিস করে বললেন,’এই কথাগুল কথায় নয়, কাজে দেখতে চাই।’
মঞ্চে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন, রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মো. নুরুল হুদা এবং পুলিশ সুপার মো. মারুফাত হুসাইন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. রফিকুল ইসলাম।
গণশুনানির দ্বিতীয় পর্বে শুরু হয় অভিযোগ শোনা। সরকারি–বেসরকারি ১২৭টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আসে ১৩০টি অভিযোগ, যার মধ্যে শতাধিক মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগের জবাবে কর্মকর্তারা নীরব, কেউবা অজুহাত খোঁজেন। দুদকের উপপরিচালক মো. আতাউর রহমান বলেন, ‘এই অভিযোগগুলো কেবল কাগজে থাকবে না; প্রতিটি মামলার পেছনে মানুষ আছে, তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।’
অডিটোরিয়ামের শেষ সারিতে বসে থাকা এক বৃদ্ধ কৃষক ধীরে উঠে দাঁড়ান। কাঁপা কণ্ঠে বলেন, ‘আমি চাই, জমি জমার কাগজ পত্র ঠিক করতে গিয়ে কেউ যেন ঘুষ না চায়।’ তার কথায় মুহূর্তের জন্য স্থানটিতে এক ধরনের ভারী নীরবতা নেমে আসে—যেন উপস্থিত সবাই একসঙ্গে নিজের বিবেকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে।
দিনের শেষে যখন চেয়ারগুলো খালি হতে থাকে, বাতাসে থেকে যায় একটা অদৃশ্য প্রতিধ্বনি—দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই লড়াই শুধু দুদকের নয়, প্রতিটি সৎ মানুষেরও।
Sharing is caring!