দুদকের সেই আলোচিত সাবেক পরিচালক সায়েমুজ্জামান এখন পঞ্চগড়ের ডিসি।
লোকমান ফারুক: বিশেষ প্রতিনিধি।
রবিবার বিকেলে। প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের করিডোরে হঠাৎ যেন হাওয়া বদলে গেল। সাদা কাগজের একখানা প্রজ্ঞাপন—আর তাতেই বদলে গেল এক জেলার নিয়তির রূপরেখা। নামটি নজর কাড়ল সবার আগে—কাজী মো. সায়েমুজ্জামান। সেই আলোচিত সাবেক দুদক পরিচালক, যিনি একসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে ঢুকে আলোড়ন তুলেছিলেন, তিনি এখন পঞ্চগড়ের নতুন জেলা প্রশাসক।
বর্তমান জেলা প্রশাসক মো. সাবেত আলীকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব করে পাঠানো হয়েছে ঢাকায়। আর তার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন সায়েমুজ্জামান—যার নাম নিয়েই এক সময় কেঁপেছিল প্রশাসনিক মহল।
দুদকের পরিচালক থাকাকালীন, তার নির্দেশেই চালানো হয় সেই বিতর্কিত অভিযান—বাংলাদেশ ব্যাংকের গোপন ভল্টে। সেখানে কর্মকর্তাদের অঘোষিত টাকার সিন্দুক উন্মোচিত হয় জনসমক্ষে। কিন্তু এরপরই শুরু হয় আরেক নাটক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপত্তি জানিয়ে চিঠি দেয় দুদকে, সায়েমুজ্জামানের নাম উচ্চারণ করা হয় প্রশাসনিক ‘অতিরিক্ত আগ্রহী কর্মকর্তা’ হিসেবে। শেষ পর্যন্ত তাকে সরিয়ে পাঠানো হয় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে।
এ যেন এক যাত্রার উল্টো গতি—দুদকের তীব্র আলো থেকে আমলাতন্ত্রের নীরব করিডোরে।
কিন্তু সময় ফের ঘুরল। মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রজ্ঞাপনে আবার উঠে এলো সেই নাম। নতুন জেলা, নতুন দায়িত্ব, আর পুরনো প্রশ্ন—প্রশাসনের সিঁড়িতে এই পদোন্নতি কী পুনর্বাসন, নাকি যোগ্যতার স্বীকৃতি?
পঞ্চগড়, দেশের উত্তর প্রান্তের সীমান্ত জেলা। তিস্তা-তোর্সার হিমেল বাতাসে এবার ভেসে আসছে রাজধানীর প্রশাসনিক উত্তাপ। নতুন ডিসি হিসেবে সায়েমুজ্জামানের আগমনকে স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা দেখছেন মিশ্র প্রতিক্রিয়ায়। কেউ বলছেন, ‘তিনি কাজের মানুষ, সাহসী।’ আবার কেউ ফিসফিস করছেন, ‘তাঁর ফাইলের পাতাগুলো কিন্তু এখনো ঠান্ডা হয়নি।’
একই প্রজ্ঞাপনে আরও ২৯ জেলার প্রশাসক বদল করা হয়েছে—একসঙ্গে এত বড় রদবদল সচরাচর দেখা যায় না। হয়তো সরকারের নতুন বার্তা এখানে লুকিয়ে—”শৃঙ্খলা ফেরাতে চাই নতুন মুখ।”
কিন্তু এই বদলির ভেতরে আছে এক অদৃশ্য গল্পও—একজন কর্মকর্তার বিতর্ক থেকে দায়িত্বের দিকে ফেরা।
যখন সায়েমুজ্জামান প্রথম দুদকের ভল্ট অভিযানে নামেন, তার চোখে নাকি ছিল প্রশাসনিক কঠোরতা আর সততার দৃঢ় ছাপ। আজ, পঞ্চগড়ের ডিসি কার্যালয়ে বসে হয়তো সেই একই চোখে অন্য এক চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন—শাসনের, সেবার, আর নিজের অতীতের ভারসাম্য রক্ষার।
শেষ বিকেলে রাজধানীর আকাশে নামছিল কুয়াশা। প্রজ্ঞাপনটি হয়তো তখনও কারও ডেস্কে উল্টানো অবস্থায় পড়েছিল। কিন্তু এক বাক্যই বদলে দিয়েছে অনেক কিছুর দিক—”কাজী মো. সায়েমুজ্জামান, জেলা প্রশাসক, পঞ্চগড়।” সময়ের সঙ্গে প্রশাসনের চরিত্র যেমন বদলায়, তেমনি বদলায় মানুষও।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—যিনি একদিন দুর্নীতির অন্ধকার ভল্টে আলো জ্বেলেছিলেন, তিনি এবার প্রশাসনের করিডোরে সেই আলো কতদূর পৌঁছে দিতে পারবেন?
Sharing is caring!