‘সংস্কার পরিষদ’ ঘিরে বৈধতা বনাম সার্বভৌমত্বের লড়াই
লোকমান ফারুক, রংপুরঃ জাতীয় সংসদের সবুজ গালিচা তখনো সকালবেলার আলোয় ভিজে। মাইক্রোফোনে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে শপথের শব্দ সংবিধান রক্ষা ও সংরক্ষণের অঙ্গীকার। কিন্তু সেই শব্দের ফাঁকেই যেন আরেকটি অদৃশ্য বাক্য ঘুরপাক খাচ্ছে সংবিধান বদলাবে কে, কীভাবে, কোন ক্ষমতায়?
এই প্রশ্নকে সামনে রেখে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বিদ্যমান সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নামে কোনো কাঠামোর উল্লেখ নেই। তৃতীয় তফসিলে শপথের যে ফরম ও পদের তালিকা নির্ধারিত তার কোথাও এই পরিষদের নাম নেই। ফলে এ ধরনের কোনো পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ পড়ানো সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্ন তোলে এটাই তাঁর যুক্তি।
অন্য প্রান্তে ১১ দলীয় জোট। তাদের বক্তব্য বিএনপি যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেয়, তারা-ও কোন শপথই নেবে না। যেন দাবার বোর্ডে দুটি ঘুটি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে; এক পা এগোলে আরেক পা সরবে। রাজনীতির এই অদৃশ্য টানাপোড়েন সংসদ ভবনের করিডোর পেরিয়ে জনমতের অন্দরে ঢুকে পড়েছে।
শপথের শব্দ, ক্ষমতার সীমা
সালাহউদ্দিন আহমদের যুক্তি আইনপুস্তকের পাতায় ঠেকানো। তাঁর ব্যাখ্যা সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে সংসদ সদস্যদের শপথের বিধান রয়েছে। স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার অনুপস্থিত বা অপারগ হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিকল্প হিসেবে শপথ পড়াতে পারেন। সেই অর্থে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সিইসির শপথ পড়ানো সাংবিধানিক এখতিয়ারের মধ্যেই পড়ে।
কিন্তু প্রশ্ন ওঠে সেই একই মঞ্চে, একই শপথ অনুষ্ঠানে, আরেকটি পরিচয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ? সংবিধানে যার উল্লেখ নেই, তার শপথ কে পড়াবেন? কী ভিত্তিতে?
বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার: সংবিধান সংশোধন করতে চাইলে সংবিধানের মধ্যেই করতে হবে। বাইরে গিয়ে কোনো কাঠামো দাঁড় করালে তা ভবিষ্যতের আদালত-প্রাঙ্গণে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। দলটির যুক্তি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সংসদই জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতিফলন; সেই সংসদের মাধ্যমেই সংশোধন হোক।
জুলাই সনদ: আদেশ না অধ্যাদেশ?
এই বিতর্কের আরেক স্তর রয়েছে। ‘জুলাই সনদ’ যা ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তি হিসেবে উঠে আসে। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির মতো দলগুলো যুক্তি দেয় এই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে গেলে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। নিয়মিত সংসদের সেই ক্ষমতা আছে কি না তা নিয়েও সন্দেহ উত্থাপিত হয়। আদালতে চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি গত বছরের ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেন। আদেশের ধারা ৮(১)-এ বলা হয়, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের পর একই অনুষ্ঠানে তফসিল-১ অনুযায়ী পরিষদ সদস্য হিসেবেও শপথ নেবেন।
এখানেই বিএনপির আপত্তি। তাদের মতে, রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন কিন্তু ‘আদেশ’ জারি করে একটি নতুন সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করা যায় কি? সংবিধানে যার স্পষ্ট ভিত্তি নেই, সেটি কি কেবল রাজনৈতিক ঐকমত্যের জোরে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে?
সার্বভৌমত্বের ভাষ্য বনাম বিধিবদ্ধতা
এখানে যুক্তির দুই মেরু। একদিকে বিধিবদ্ধ সংবিধান যার প্রতিটি ধারা আদালতে পরীক্ষিত হতে পারে। অন্যদিকে ‘জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা’ যা গণঅভ্যুত্থানের আবেগ ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের মাধ্যমে প্রকাশিত।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের প্রধান নির্বাহী ও সাবেক ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংবিধানে সবকিছু সরাসরি উল্লেখ থাকে না। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পর গণতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়ায় বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর উদারতা ও সমঝোতা জরুরি। তাঁর বক্তব্যে আইনের অক্ষর নয়, প্রাধান্য পায় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় উদারতা কি আইনকে অতিক্রম করতে পারে? নাকি আইনই উদারতার সীমারেখা টেনে দেয়?
নাটকীয়তার অন্তরালে নীরব আশঙ্কা
রাজনীতির এই অধ্যায়ে নাটকীয়তা আছে, আছে বৈপরীত্যও। যারা গণঅভ্যুত্থানের সার্বভৌমত্বের কথা বলছেন, তারা ভবিষ্যতের আদালত-চ্যালেঞ্জের আশঙ্কাও তুলছেন। যারা সংবিধানের শুদ্ধতার কথা বলছেন, তাদেরও লক্ষ্য সংবিধান সংস্কার। উদ্দেশ্য এক, পথ আলাদা।
বিএনপির শর্ত প্রথমে সংবিধানে সংশোধন এনে পরিষদের ধারণা যুক্ত করা হোক, তৃতীয় তফসিলে শপথের ফরম নির্ধারণ হোক, কে শপথ পড়াবেন তা স্পষ্ট হোক। তারপর উদ্যোগ নিন। এর আগে নয়। অন্যদিকে ১১ দলীয় জোট বলছেন গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের ম্যান্ডেটই সর্বোচ্চ বৈধতা।
এই টানাপোড়েনে সংসদ ভবনের ভেতরে যে শপথ উচ্চারিত হচ্ছে, তা যেন দুই অর্থে ধ্বনিত একটি বর্তমানের প্রতি আনুগত্য, অন্যটি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি।
সূচনা যেখানে, সমাপ্তিও সেখানে
সকালবেলার সেই শপথ অনুষ্ঠানে ফিরে যাই। মাইক্রোফোনে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ সংবিধান রক্ষার অঙ্গীকার। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন—সংবিধান রক্ষা মানে কি তাকে অপরিবর্তনীয় রাখা, নাকি সময়ের দাবি মেনে পরিবর্তনের পথ খুলে দেওয়া?
আইনের ভাষা শীতল, রাজনীতির ভাষা উষ্ণ। একদিকে বিধান, অন্যদিকে অভিপ্রায়। এই দুইয়ের সংঘাতে যে নতুন অধ্যায় রচিত হচ্ছে, তা কেবল একটি পরিষদের শপথ নিয়ে নয় বরং রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস, সীমা ও বৈধতার প্রশ্ন নিয়ে।
শেষ পর্যন্ত হয়তো নির্ধারণ করবে জনগণ-কিন্তু আপাতত, সবুজ গালিচায় উচ্চারিত শপথের শব্দে একটি অদৃশ্য প্রতিধ্বনি রয়ে গেছে: সংবিধান কেবল একটি দলিল নয়, এটি ক্ষমতার আয়না। আর আয়নায় কে কী দেখতে চায় সেই লড়াই এখনো শেষ হয়নি।
Sharing is caring!