লিখিত আদেশ ছাড়াই সরে দাঁড়াতে বলা হলো রেজিস্টারকে
লোকমান ফারুক, রংপুরঃ রবিবার সকাল। কুয়াশা কাটেনি পুরোপুরি। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঢোকার সময় রেজিস্ট্রার ড. হারুন অর রশীদের হাতে ছিল একটি ফাইল। নিয়মিত দিনের মতোই। কিন্তু দিনটি নিয়মিত ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে এমন তথ্য একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হন তিনি। যদিও আনুষ্ঠানিক কোনো আদেশ এখনো জারি হয়নি, তার পরিবহন সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। প্রশাসনিক কাজেও বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সকালে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলীর দপ্তরে একটি বৈঠক হয়। উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন শিক্ষক, ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. তরিকুল ইসলাম, কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামানসহ অন্তত ১০ থেকে ১২ জন। বৈঠকের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচি প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু বৈঠকের পরপরই রেজিস্ট্রারের দপ্তরে নড়াচড়া শুরু হয়।
ড. হারুন বলেন, “গতকাল একজন শিক্ষক ফোন করে আমাকে অফিসে না আসতে বলেন। বলেন, ছুটিতে থাকুন। আমি বলেছি, কেন? লিখিত নির্দেশ দিন।”
তিনি থামলেন। তারপর যোগ করলেন, “আজ সকালে অফিসে এলে আবার ফোন। বলা হলো, অফিস ছাড়ুন।
দুপুরের দিকে ডেপুটি রেজিস্ট্রার তার দপ্তরে যান। অভিযোগ আছে, সেখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরে যেতে বলা হয়। ড. হারুনের ভাষ্য, “একটি দল এসে বলে গেছে, আমার কাছে যেন কোনো ফাইল না আসে। আমার দপ্তরের লোকজনকেও সরিয়ে দেওয়া হয়।
এর আগে নির্বাচনকে ঘিরে তাকে ‘জামাতি রেজিস্ট্রার’ আখ্যা দিয়ে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে প্রেস ব্রিফিং করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষায়,”চাকরিচ্যুত করার চেষ্টা চলছিল আগেই।”
দুপুরে আরেকটি দৃশ্য তৈরি হয়। ড. হারুন গাড়িতে উঠতে গেলে তাকে জানানো হয়, পরিবহন সুবিধা বাতিল। ‘আপনি আর গাড়ি পাবেন না,’ এমনটাই বলা হয় বলে দাবি তার। পরে তিনি রিকশায় করে ক্যাম্পাস ছাড়েন।
সূত্র জানায়, জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডেকে দু’এক দিনের মধ্যে তার চুক্তি বাতিল করে নতুন রেজিস্ট্রার নিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, “আমি মিটিংয়ে ছিলাম। তবে সেটি অন্য বিষয়ে। রেজিস্ট্রারের বিষয়ে কোনো মিটিং হয়নি। এ বিষয়ে বলার এখতিয়ারও আমার নেই। উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলুন।”
উপাচার্যের নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলে তার ব্যক্তিগত সচিব মো. খাইরুল ইসলাম জানান, “স্যার মিটিংয়ে আছেন। কখন শেষ হবে বলা মুশকিল।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে-ভেতরে প্রশ্ন ঘুরছে এটি কি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, নাকি রাজনৈতিক চাপের ফল? একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন চুক্তিভিত্তিক রেজিস্ট্রারকে সরানোর প্রক্রিয়া কি এভাবেই শুরু হয় মৌখিক নির্দেশ, পরিবহন বাতিল, দপ্তর খালি করা?
বিশ্ববিদ্যালয় মানে শুধু ইট-সিমেন্ট নয়। এখানে বিধি আছে, প্রক্রিয়া আছে, নথি আছে। প্রশ্ন হলো, সেই প্রক্রিয়াগুলো কি অনুসৃত হচ্ছে? নাকি ক্ষমতার অদৃশ্য রেখাই ঠিক করে দিচ্ছে কে থাকবে, কে যাবে?
এই ঘটনার নথি হয়তো শিগগিরই প্রকাশ পাবে। কিন্তু তার আগে যে নীরবতা তৈরি হলো তার দায় নেবে কে?
Sharing is caring!