৩রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১৪ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

রংপুরে মিথ্যা মামলায় সাংবাদিক মানিক গ্রেপ্তার— পীরগাছায় আতঙ্কের বাতাস, প্রশ্নের মুখে পুলিশি নিরপেক্ষতা।

admin
প্রকাশিত নভেম্বর ১৬, ২০২৫, ০৫:৫৯ অপরাহ্ণ

Manual2 Ad Code

রংপুরে মিথ্যা মামলায় সাংবাদিক মানিক গ্রেপ্তার—

পীরগাছায় আতঙ্কের বাতাস, প্রশ্নের মুখে পুলিশি নিরপেক্ষতা।

লোকমান ফারুক : রংপুর।

রাত তখন প্রায় সাড়ে আটটা। কৈকুড়ি ইউনিয়নের চৌধুরাণীর হাটে দিনের শেষ আলো মুছে গিয়ে দোকানপাটের দরজা নামতে আর অল্প বাকি। হাটের ভেতর আচমকা কোলাহল—দু’জন পুলিশ সদস্য এগিয়ে এলেন সাংবাদিক আসাদুজ্জামান মানিকের দিকে। এক নাগাড়ে কিছু প্রশ্ন, তারপর গ্রেফতার। মুহূর্তেই হাটের নিস্তব্ধতা ছিন্ন হয়ে মানুষের ভিড় জমতে লাগল।

মানুষের চোখে বিস্ময়, মুখে একই প্রশ্ন—’মানিককে কেন?’ এ যেন গল্পের কোনো সরু মোড়, যেখানে বাস্তবতার আলো-ছায়া মিলেমিশে হয়ে ওঠে তীব্র নাটকীয়তা।

এক মাস আগের ‘ঘটনা’, হঠাৎ মামলা—হওয়ার কথা নয়, কিন্তু হলো। মানিক, কৈকুড়ির নওদাপাড়ার বাসিন্দা, পীরগাছা প্রেস ক্লাবের কার্যকরী সদস্য এবং ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’-এর প্রতিনিধি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ—গত ২০ অক্টোবর প্রতিবেশী আবু বক্কর সিদ্দিকের পুকুরে বিষ দিয়ে মাছ চুরি। এক মাস ধরে অভিযোগকারী চুপ ছিলেন, কোনো আলামত নেই, কোনো সাক্ষী নেই—হঠাৎ গত শুক্রবার মামলাটি রেকর্ড হলো। এ যেন নড়বড়ে কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো অভিযোগ, যার ভিত কোথায়—তা খুঁজে পাওয়া দায়।

Manual8 Ad Code

 

স্থানীয়রা বলেন, ‘এমন ঘটনা ঘটেনি। মানিকের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা ব্যক্তিগত শত্রুতার জের।’

তাদের কথায় সন্দেহ, ক্ষোভ আর হতাশার গন্ধ। যে সাংবাদিক ঘটনাস্থল ঘুরে ঘুরে অনিয়ম খুঁজে বের করতেন, তার বিরুদ্ধে এমন মামলা—এ যেন অন্ধকারে ছোড়া তীর যার লক্ষ্য আগেই ঠিক করে রাখা।

সাংবাদিক মানিক কি টার্গেট ছিলেন?

কিছু সহকর্মীর দাবি, ‘এলাকায় বিভিন্ন অনিয়মের প্রতিবাদ করায়, মানিককে টার্গেট করা হয়েছে।’ এ অভিযোগ বলছে, প্রকাশ্য কোনো শত্রুতা ছিল না, কিন্তু নীরব ‘বিরক্তি’ ছিল যথেষ্ট। অনেকে বলছেন—’দশ হাতের মধ্যে গণ্ডগোল না থাকলে, এ ধরনের মামলা এতদিন চাপা পড়ে থাকলো কেন?’

পীরগাছা প্রেস ক্লাব এক বিবৃতিতে নিন্দা জানিয়েছে,

তাদের বক্তব্য—”মিথ্যা মামলায় একজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে এই প্রবণতা ভয়ংকর নজির তৈরি করবে।”

পীরগাছায় মামলা-হয়রানির নতুন ‘নিয়ম’?

Manual4 Ad Code

প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুছ সরকারের ভাষায়—”এখানে মামলার নামে হয়রানি এখন নিয়মিত ব্যাপার।” তিনি আরও বলেন, ‘কোনো অভিযোগের ভিত্তি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আগেই মামলা রেকর্ড করা হয়। এরপর গ্রেপ্তার—এটা এখন লাভজনক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।’

সহ-সভাপতি হারুনুর রশিদ বাবুর কথা আরও কঠোর—

‘২৪ পরবর্তী সময়েও পীরগাছা থানা পুলিশ ফ্যাসিবাদী কায়দায় মানুষকে হয়রানি করছে। সাংবাদিকরাও বাদ পড়ছেন না। কিছু পুলিশ সদস্য ক্ষমতাকে হাতিয়ার বানিয়ে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করছেন।’

এ যেন সেই প্রবাদ—”চোর না থাকলে পুলিশও বাঁচে না”—কিন্তু এখানে চোরের খোঁজে গিয়ে যেন পুলিশই হয়ে উঠছে গল্পের ‘অযাচিত নায়ক’। পুলিশের সামনে প্রশ্ন—অধ্যাদেশ কি মানা হলো?

‘সাংবাদিক অধিকার সুরক্ষা অধ্যাদেশ’-এর খসড়ায় স্পষ্ট নির্দেশ—সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে স্বাধীন ও প্রাথমিক যাচাই-বাছাই বাধ্যতামূলক।

মানিকের ক্ষেত্রে কি তা হলো?

এই প্রতিবেদকের প্রশ্ন—ব্যক্তিগত শত্রুতা ও পূর্ববিরোধের জেরে আনা অভিযোগটি যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়—পুলিশ কীভাবে নিশ্চিত হলো? স্বাধীন তদন্ত হয়েছে কি?

ওসি তদন্ত আমিরুল ইসলাম জবাব দিলেন—

“প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় মানিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’ তাকে সাংবাদিক হিসাবে নয়, আসামি হিসেবেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক আছে।’

Manual8 Ad Code

কথাগুলো শুনে মনে হয়, যেন আগুনের ধারে দাঁড়িয়ে বলা হচ্ছে—‘আগুন নেই, কেবল ধোঁয়া।’ কিন্তু ধোঁয়া কি কখনও নিজে নিজে তৈরি হয়?

মানিকের গ্রেপ্তার—শুধু একজনের ঘটনা নয়।এলাকার চায়ের দোকানে, বাজারের মোড়ে, গলিতে–মানুষ বলছে, ‘আজ মানিক, কাল আরেকজন—এভাবে ভয় ছড়িয়ে পড়ছে।’

সাংবাদিকদের ভাষায়, ‘এটি শুধু মানিকের ওপর আঘাত নয়, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার গলায় ফাঁস।’ নিরাপত্তার দায়িত্বে যারা, তাদের কাছেই মানুষের প্রশ্ন?

পীরগাছার বাতাসে এখন এক অদৃশ্য অসন্তোষ ভাসছে।

এ যেন নাটকের শেষ অঙ্কে এসে দাঁড়িয়ে থাকা এক নৈতিক প্রশ্ন—আইন কার জন্য? ক্ষমতা কার হাতে? আর সত্যের পাশে দাঁড়াবে কে?

মানিককে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি তাই শুধু একটি মামলার গল্প নয়—এটি রংপুরের এক অন্ধকার বাস্তবতার দরজা খুলে দেখিয়েছে, যেখানে সাংবাদিকতা ঝুঁকি, আর সত্য বলা অপরাধের পর্যায়ে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে—’এই মিথ্যা মামলায় কি শুধু একজন মানুষকে নয়, পুরো সমাজকেই বন্দি করা হলো?’

Manual7 Ad Code

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code