১৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৮শে রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

শ্রম পরিদর্শন: লাইসেন্সে অস্বচ্ছতা, বোনাসে নীরবতা

editor
প্রকাশিত মার্চ ১৭, ২০২৬, ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ
শ্রম পরিদর্শন: লাইসেন্সে অস্বচ্ছতা, বোনাসে নীরবতা

Manual6 Ad Code

শ্রম পরিদর্শন: লাইসেন্সে অস্বচ্ছতা, বোনাসে নীরবতা

লোকমান ফারুক, রংপুরঃ বিকেলের দিকে রংপুরে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয়ের করিডোরে বসে আছেন কয়েকজন উদ্যোক্তা। কারও হাতে ফাইল, কারও চোখে অস্বস্তি। উপমহাপরিদর্শকের কক্ষের সামনে অপেক্ষা করছেন তারা। সাধারণত শিল্প প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স গ্রহণ, নবায়ন বা পরিদর্শন সংক্রান্ত কাজগুলো এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত শ্রম পরিদর্শকের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। জটিলতা দেখা দিলে তবেই বিষয়টি আঞ্চলিক কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার টেবিলে ওঠে। কিন্তু সেদিনের দৃশ্যটা ছিল ভিন্ন।

Manual7 Ad Code

অপেক্ষমাণদের একজনের কাছে জানতে চাইলে তিনি নিচু স্বরে বলেন—”লাইসেন্স পেতে যা লাগে সব কাগজ দিয়েছি। তারপরও নতুন নতুন কাগজ চাইছে। আজ নিয়ে চার দিন আসলাম। দেখি আজ কী হয়।” এই অভিজ্ঞতা শুধু একজনের নয়। রংপুর ও নীলফামারী অঞ্চলের একাধিক শিল্প উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে এমন অভিযোগই উঠে এসেছে। তবে প্রায় সবাই কথা বলেছেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে। কারণ, তাদের ভাষায়—”নাম প্রকাশ হলে, তাদের উচিত শিক্ষার হাত হতে রেহাই পাওয়া যাবে না।”

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রংপুর অঞ্চলের কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রদান বা নবায়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপমহাপরিদর্শক আল আমিন সরাসরি যোগাযোগ করেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।
প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী লাইসেন্স প্রক্রিয়া হওয়ার কথা নথি যাচাই, পরিদর্শন ও নির্ধারিত ধাপ অনুসরণ করে। কিন্তু কয়েকজন উদ্যোক্তার অভিযোগ, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া নির্ভর করছে ব্যক্তিগত যোগাযোগের উপর। একজন উদ্যোক্তা বলেন—
“কাগজপত্র ঠিক থাকলেও অনেক সময় ফাইল এগোয় না। পরে বোঝানো হয় কিছু বিষয় ‘ঠিক করতে’ হবে।”
আরেকজন উদ্যোক্তার দাবি, লাইসেন্স অনুমোদনের আগে অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করা হয় এবং পরে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হয়।
কিছু উদ্যোক্তার অভিযোগ, নির্দিষ্ট কিছু লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের দাবিও করা হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য কোনো নথি পাওয়া যায়নি; অধিকাংশ সূত্রই কথা বলেছেন গোপনীয়তার শর্তে।

Manual2 Ad Code

রংপুর ও নীলফামারী অঞ্চলে শতাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। হোটেল ও রেস্তোরাঁয় হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করেন। বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী উৎসব উপলক্ষে-শ্রমিকদের আইনসম্মত উৎসব বোনাস প্রদান বাধ্যতামূলক। কিন্তু শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে এই আইন প্রয়োগ হয় না বা আংশিকভাবে মানা হয়। একজন শ্রমিক নেতা বলেন—
“যদি নিয়মিত পরিদর্শন হতো, তাহলে অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের বোনাস দিতে বাধ্য হতো।” শ্রমিকদের অভিযোগ, তদারকি কার্যক্রম দৃশ্যমান না হওয়ায় মালিকপক্ষের উপর আইনের চাপও কমে যায়।
ফলে একদিকে শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওনা নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন, অন্যদিকে প্রশাসনিক কার্যক্রম ঘিরে ওঠে ভিন্ন ধরনের অভিযোগ।

অনুসন্ধানে আরও একটি বৈপরীত্যের কথা উঠে এসেছে। স্থানীয় কয়েকজন উদ্যোক্তার অভিযোগ, বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর লাইসেন্স নবায়ন বা প্রশাসনিক কাজ তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন হয়। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় ফাইল দীর্ঘদিন আটকে থাকে। একজন ব্যবসায়ীর ভাষ্য—”বড় কোম্পানির কাজ দ্রুত হয়ে যায়। ছোটদের ক্ষেত্রে বারবার আসতে হয়।” এই পার্থক্যের কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো প্রশাসনিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ শ্রম আইনে শ্রমিকদের সুরক্ষা, কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি এবং উৎসব বোনাসের মতো বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন চিত্র দেখায়। শ্রমিক ও উদ্যোক্তাদের একাংশের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠানে আইন লঙ্ঘন হলেও নিয়মিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা দেখা যায় না। একজন শ্রমিক বলেন—”আইন যদি বাস্তবে না থাকে, তাহলে কাগজে থাকলেই বা কী লাভ?”

রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপমহাপরিদর্শক আল আমিনের কাছে এসব অভিযোগ সম্পর্কে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয়। প্রশ্নগুলোর মধ্যে রয়েছে—লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন প্রক্রিয়ায় তার সরাসরি ভূমিকার অভিযোগ;
গত ছয় মাসে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে নেওয়া আইনি ব্যবস্থা; শ্রমিকদের উৎসব বোনাস নিশ্চিত করতে পরিচালিত পরিদর্শনের সংখ্যা। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কাছ থেকে কোনো লিখিত প্রতিক্রিয়া বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার দপ্তর হতে, একজন শ্রম পরিদর্শক এই প্রতিবেদককে চা এর আমন্ত্রণ জানালে। প্রতিবেদক সে আমন্ত্রণ গ্রহণ করেননি।

Manual4 Ad Code

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর-এর মূল দায়িত্ব—শ্রমিকের অধিকার রক্ষা এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানে শ্রম আইন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। কিন্তু যদি সেই দপ্তরকে ঘিরে লাইসেন্স প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার অভিযোগ ওঠে, তাহলে প্রশ্নটি আর কেবল একটি কার্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি হয়ে দাঁড়ায় ব্যবস্থার প্রশ্ন।
লাইসেন্সের ফাইলে যদি বড়কর্তাই সব করার অভিযোগ ওঠে, আর শ্রমিকের উৎসব বোনাস যদি অনিশ্চিত থাকে—তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায়—এই ব্যবস্থায় আসলে লাভবান হচ্ছে কে? আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কারা?

Manual3 Ad Code

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code