ডেস্ক রিপোর্ট, রংপুর
পীরগঞ্জের জামতলা সড়কের সোনাকান্দর কলার হাটে কলা বোঝাই গাড়ির হর্নে গমগম করছে চারদিক। ঠিক সেই সময়, এক মুহূর্তের ভুলে থেমে গেল দুইটি প্রাণের যাত্রা।
রংপুরের পীরগঞ্জে ইটবোঝাই মাহিন্দ্রা ট্রাক্টরের ধাক্কায় বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রাণ হারান গঙ্গারামপুরের পিয়ারি বেগম (৪৫) ও গাইবান্ধার সোলাইমান (৩৮)। ঘটনাস্থলেই মারা যান পিয়ারি বেগম, আর গুরুতর আহত সোলাইমানকে পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন
। স্থানীয়দের বর্ণনায়, বিকট শব্দে সড়কের বাতাস ছিন্ন করে ছুটে আসে ট্রাক্টরটি। মুহূর্তেই দুমড়ে যায় অটোভ্যান।
দুলা মিয়া তখন বাজারমুখী ভ্যানে ছিলেন স্ত্রীর পাশে, কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতায় মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই হারান প্রিয় মানুষটিকে। ঘটনার পর ঘাতক ট্রাক্টর ও চালক সটকে পড়ে। পুলিশের একটি দল এসে মরদেহ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।
পীরগঞ্জ থানার ওসি শফিকুল ইসলাম জানান, ‘দুর্ঘটনার পর আইনি প্রক্রিয়া চলছে, সড়ক আইনে মামলা নেওয়া হচ্ছে।’ কিন্তু এই একটি দুর্ঘটনা আলাদা কিছু নয়—এ যেন নিয়মিত এক অনিয়মের নাম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সোনাকান্দর-জামতলা সড়কটি এখন ‘মৃত্যুর পথ’। দিনে-রাতে ট্রাক্টর, মাহিন্দ্রা, নসিমন, করিমনের দৌরাত্ম্যে সড়কজুড়ে আতঙ্ক। গ্রামের এক দোকানদার সোহেল মিয়া বলেন, ‘প্রায়ই শুনি কারও হাত-পা গেছে, কারও প্রাণ গেছে। কেউ দেখে না, পুলিশও আসে না।’
বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব ট্রাক্টর স্থানীয় ইটভাটায় মাটি ও ইট পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। তাদের বেশিরভাগই অননুমোদিত, চালকেরা অধিকাংশই কিশোর বা অপরিজ্ঞাত। ফিটনেস ও রেজিস্ট্রেশনের তোয়াক্কা না করে এসব যানবাহনই এখন গ্রামীণ সড়কের রাজা। দুর্ঘটনা ঘটলে দায় শুধু ভাগ্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়—যেন মৃত্যু আর অবহেলা এখানে সহাবস্থানের সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
পীরগঞ্জের এক কৃষক কায়সার আলী বলেন, ‘এই রাস্তা দিয়ে আমাদের বাচ্চারা স্কুলে যায়। সকাল-বিকেল ট্রাক্টরের দাপটে তারা রাস্তা পার হতে ভয় পায়।’ কৃষকের সেই ভয়ই যেন বাস্তবে পরিণত হলো পিয়ারি বেগম ও সোলাইমানের মৃত্যুতে।
একদিকে আইন আছে, অন্যদিকে তার প্রয়োগের অনুপস্থিতি—এই ব্যবধানেই প্রতি বছর হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য প্রান। রোদ ঢলে গেলে কলার হাটের বাতাসে লেগে থাকে ধুলো, আর তার ভেতর দিয়ে শোনা যায় এক বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাস—’এই রাস্তা যেন মৃত্যুর ডাকপিয়ন হয়ে গেছে, কে শোনে কার কথা!’
পীরগঞ্জের এই সড়ক দুর্ঘটনা কেবল দুটি প্রাণহানির সংবাদ নয়; এটি এক চলমান অবহেলার প্রতীক। যেখানে প্রশাসনের চোখ বুজে থাকা মানেই, প্রতিদিনের সূর্যাস্তের সঙ্গে আরেকটি জীবন নিভে যাওয়া।
Sharing is caring!