লোকমান ফারুক, রংপুর
মাঘের সকালের শীত রংপুরে খুব বেশি কামড়ায় না। কিন্তু নির্বাচনের উত্তাপ এবার শীতকেও হার মানিয়েছে। শহর থেকে গ্রাম-সবখানেই শব্দ। মাইকে গান, ডিজিটাল স্ক্রিনে থিম সং, উঠান বৈঠকে প্রতিশ্রুতি। পোস্টার নেই, দেয়াল নীরব। অথচ বাতাসে ভাসছে একটাই প্রশ্ন- এইবার কি ভোটটা সত্যিই দেওয়া যাবে?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ১৩ দিন বাকি। রংপুরে ছয়টি আসন। প্রতিটি আসনেই ব্যস্ত প্রার্থীরা। বিএনপি সব আসনে প্রার্থী দিয়েছে। আসন সমঝোতায় একটিতে এনসিপিকে সমর্থন, পাঁচটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী। সঙ্গে মাঠে রয়েছে জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, বাম দলগুলো, ছোট দল আর স্বতন্ত্ররা। নির্বাচনী মাঠে ভিড় বাড়ছে। কিন্তু ভোটারদের চোখে উত্তেজনার চেয়ে হিসাব বেশি।
রংপুর স্বাধীনতার পর থেকেই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই জেলা দিয়েছে রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্ব। এবারও ছয় আসনে ৪৪ জন প্রার্থী। হেভিওয়েট নামগুলো আলোচনায়-রংপুর-২ এ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম, রংপুর-৪ এ এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, রংপুর-৩ এ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের।
এর মাঝেই ব্যতিক্রমী উপস্থিতি—রংপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী, তৃতীয় লিঙ্গের আনোয়ারা ইসলাম রানী। প্রতীক ‘হরিণ’। আগেও লড়েছেন। ভোট পেয়েছেন ২৩ হাজারের বেশি। তিনি বলছেন, “আমি সংসদে যেতে চাই মানুষের মর্যাদার কথা বলতে।”
ভোটের মাঠে প্রতিশ্রুতি আছে। কিন্তু বিশ্বাসের ঘাটতি স্পষ্ট। সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজের শিক্ষার্থী কানিজ ফারিহা প্রথমবার ভোট দেবেন। তিনি বললেন, “আমি চাই ভয়হীন পরিবেশে যেন ভোট দিতে পারি।’ আমার ভোট যেন আগে কেউ দিয়ে না যায়।’ এই ভয় নতুন না। বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচন ভোটাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সেই স্মৃতি এখনো তাজা। তাই তরুণ ভোটাররা এবার শুধু উন্নয়ন নয়, নিরাপত্তা চায়।
রংপুর-২ আসনের একজন নাগরিক ও অধিকারকর্মী সেলিম সরকার বলেন, “আমরা এমন কাউকে চাই, যে আমাদের পাশে দাঁড়াবে। প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবে কাজ করবে।” জুম্মাপাড়ার দুইজন ভোটার শহরের সমস্যার কথা বললেন, অবহেলা, ছোট শহর, ভাঙা সড়ক, চিকিৎসার অভাব।
একজন বলেন, “এমন এমপি চাই, যে আমাদের কথা বাজেটে তুলবে।” রংপুর-৫ আসনের ব্যবসায়ী আবু আসলাম আরও সরাসরি, “রংপুর সব আন্দোলনে সামনে। কিন্তু উন্নয়নে শূন্য। শিল্প নেই, ইপিজেড নেই। এটা কেন?
সব আলোচনার কেন্দ্রে তিস্তা। নদী আছে, পানি নেই। রাজনীতি আছে, সমাধান নেই। তিস্তাপাড়ের ১০ জন ভোটারের মধ্যে ৮ জন একই কথা বলেন- “এবার আর প্রতিশ্রুতি নয়। কাজ চাই।”
প্রার্থীরাও কথা বলছেন; এনসিপির আখতার হোসেন বলেন, “আমরা স্বচ্ছতার রাজনীতি চাই। রংপুরকে এগিয়ে নিতে চাই।” জামায়াতের এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, “মানুষ পরিবর্তন চায়। কল্যাণকর রাষ্ট্র চায়।” বিএনপির সামসুজ্জামান সামু বলেন, “এইবার আবেগ নয়, বিবেকের ভোট।
সবাই আশ্বাস দিচ্ছেন। সবাই পরিবর্তনের কথা বলছেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান জানান, রংপুরে ভোটার ২৫ লাখ ৯৯ হাজারের বেশি। কেন্দ্র ৮৭৩টি। বুথ প্রায় পাঁচ হাজার। প্রশাসন বলছে, নির্বাচন হবে শান্তিপূর্ণ।
কিন্তু ভোটারদের প্রশ্ন অন্য জায়গায়। এই শান্ত পরিবেশ ভোটের দিনও থাকবে তো? ভোট কি সত্যিই ভোটারের হাতেই থাকবে?
আর রংপুর-এইবার কি প্রতিশ্রুতির বাইরে কিছু পাবে?
উত্তরটা এখনো ব্যালটের বাক্সে বন্দি।
Sharing is caring!