২১শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২রা শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

আশরাফুলকে নিজ গ্রামে দাফন, বন্ধুসহ গ্রেপ্তার ২ জন।

admin
প্রকাশিত নভেম্বর ১৫, ২০২৫, ০৯:০০ অপরাহ্ণ

Manual5 Ad Code

আশরাফুলকে নিজ গ্রামে দাফন, বন্ধুসহ গ্রেপ্তার ২ জন।

লোকমান ফারুক : বিশেষ প্রতিনিধি।

রংপুরের বদরগঞ্জের গোপালপুর ইউনিয়নে নয়াপাড়ার ভোরটা ছিল অন্যরকম। কুয়াশার চাদর তখনো পুরোপুরি সরেনি। আল মাহফুজ মাদ্রাসা মাঠে জমতে থাকা মানুষের মুখে আলো ছিল না—ছিল অবাক নিঃশ্বাস, আর এক অজানা শোকে স্তব্ধতা। সকাল সাড়ে আটটায় জানাজার জন্য যখন এগিয়ে যাচ্ছেন গ্রামবাসী। তখন পুরো মাঠ যেন ভারী হয়ে উঠেছিলো ২৬ টুকরো করা এক মরদেহের যন্ত্রণায়।

রাত সাড়ে তিনটায় একটি অ্যাম্বুলেন্স এসে থামে নয়াপাড়ার সড়কের পাশে। হেডলাইটের আলোয় প্রথম দেখা যায় সাদা ব্যাগে মোড়ানো খণ্ডিত মরদেহ—অচেনা, অথচ নিজের মানুষ। স্বজনদের কান্না তখন আর কান্না থাকে না—হাহাকারের মতো ছড়িয়ে পড়ে চারদিক। যেন কেউ ছুরি দিয়ে রাতের নিস্তব্ধতাকে কেটে দিয়েছে।

Manual3 Ad Code

এই মরদেহের পরিচয়—আশরাফুল হক। রংপুরের ব্যবসায়ী, পরিবারে ভরসার নাম। কিন্তু মৃত্যুর গল্পটি এত নির্মম যে গ্রামের মানুষ চোখ তুলে তাকাতেও ভয় পায়। ঢাকা হাইকোর্ট মাজারের পাশের একটি সিঁড়িঘর—যেখানে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দুটি নীল ড্রামের ভিতর থেকে পাওয়া যায় তার ২৬ টুকরো দেহাবশেষ। প্রযুক্তির সহায়তায় মিলে পরিচয়; আর পুলিশি সূত্র বলছে—হত্যাকাণ্ডটি ছিল পরিকল্পিত, কিন্তু ঠাণ্ডা মাথার।

Manual3 Ad Code

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ভাষ্যমতে, আশরাফুলকে হত্যার পেছনে ছিল ‘পরকীয়ার দ্বন্দ্ব’। আর এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি হতে পারে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু—জারেজুল ইসলাম। যাকে শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৩ ও গোয়েন্দা পুলিশ। একই সময় ধরা পড়ে জারেজের প্রেমিকা শামীমাও। তাদের সঙ্গে থাকা কিছু আলামতও জব্দ করা হয়—যেগুলো এখন তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

জারেজ ছিলেন আশরাফুলের বাল্যবন্ধু। মালয়েশিয়া প্রবাস থেকে ফিরে আসার পর হঠাৎই জাপান যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। সেই স্বপ্নের দাম? ২০ লাখ টাকা। আর সেই টাকা ধার দিতে রাজি হয়েছিলেন আশরাফুল। ১১ নভেম্বর তিনি বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা যান—যেন বন্ধুত্বের পথে বিশ্বাস রেখে পা বাড়ানো। কিন্তু সেই পথই শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে যায় মৃত্যুর দিকে।

Manual3 Ad Code

ডিবির মতে, ২৪ ঘণ্টার ভয়ংকর পরিকল্পনার মধ্যে বাথরুমেই খণ্ডিত করা হয় আশরাফুলের দেহ। পরে রাতের অন্ধকারে ড্রামে ভরে ফেলে দেওয়া হয় হাইকোর্ট মাজারের পাশে। এক ধরনের ‘গায়েব করে দেওয়ার’ প্রচেষ্টা—যা শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির চোখ এড়াতে পারেনি।

গ্রামের মানুষ বলছে, “বন্ধুত্বের ওপর এমন ছুরি কেউ চালাতে পারে?” প্রবাদ আছে—বিশ্বাস ঘাতকের ছুরি লাগে পেছন দিক থেকেই। আশরাফুলের মৃত্যু যেন সেই প্রবাদকেই নতুন করে সত্য করল।

জানাজার শেষে, যখন দাফন সম্পন্ন হলো, মাঠের নীরবতা আরও ঘন হয়ে উঠল। গ্রামের কবরস্থান যেন এক মুহূর্তের জন্যই হয়ে উঠল ন্যায়ের আদালত; যেখানে প্রশ্ন দাঁড়িয়ে থাকে—বন্ধুত্বের অবসানে কি এভাবেই শেষ হয় একজন মানুষের গল্প?

Manual3 Ad Code

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক অন্ধকার সুতোয় বাঁধা এই হত্যার রহস্য। কিন্তু আশরাফুলের কবরের মাটি চাপা দেওয়ার পরও ভেসে ওঠে একই অনুভব—

একজন মানুষকে হত্যা করা মানে তার পুরো পৃথিবীটাকে ভেঙে ফেলা; আর বিশ্বাসঘাতকতা সেই ভাঙনের প্রথম আঘাত।

শেষ পর্যন্ত সেই আঘাতই যেন এই প্রতিবেদনের শুরুতে ফিরে আসে—রাতের আঁধারে অ্যাম্বুলেন্সের আলো আর স্বজনদের হাহাকারের কাছে।

এক মৃত্যু, দুই গ্রেপ্তার; বাকি রয়ে গেছে সত্যের পূর্ণচিত্র—যা তদন্তের আলোয় এখনও প্রকাশিত হতে বাকি।

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code