লোকমান ফারুক, রংপুর
রংপুর শহরের ভোরগুলো এখন আগের মতো নয়। কুয়াশার ভেতর দিয়ে শুধু সূর্য ওঠে না-উঠে আসে হিসাব। কে কোথায় দাঁড়িয়ে, কার কতটা ভিত্তি, আর কার কথায় কতটা ওজন-সবকিছুরই এখন মাপকাঠি আছে।
সেই মাপকাঠির নাম সংখ্যা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রংপুর সদর-৩ আসনে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তা শুধু স্লোগানের নয়-এটি অঙ্কের উত্তাপ।
আসনের অঙ্ক: শক্ত দুর্গ, বড় ভোটব্যাংক
রংপুর সদর-৩ আসনে মোট ভোটার প্রায় ৩ লাখ ৯৪ হাজার। এর মধ্যে-শহুরে ভোটার: আনুমানিক ৬০% গ্রামীণ ভোটার: প্রায় ৪০% যুব ভোটার (১৮-৩৫): প্রায় ৩২–৩৫% এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়-এটি কেবল ঐতিহ্যের আসন নয়, পরিবর্তনের সম্ভাবনার আসনও।
জাতীয় পার্টি: দুর্গ আছে, কিন্তু ব্যবধান কমছে।
গত তিনটি নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়-জাতীয় পার্টি জয়ী হলেও, ভোট ব্যবধান ধীরে ধীরে কমেছে। বিরোধী ভোট ছিল বিভক্ত।
রাজনৈতিক ভাষায় একে বলা হয়-(প্রাধান্যের ক্ষয়)-জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা যখন বলেন, “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হলেই জানা যাবে কার অবস্থান কোথায়-” এই বক্তব্য আসলে একটি আত্মবিশ্বাস ও আশঙ্কার যুগল প্রকাশ।
ডেটা বলছে: জাতীয় পার্টির মূল শক্তি এখনও আছে, কিন্তু একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ আর আগের মতো নিরঙ্কুশ নয়।
বিএনপি: ক্ষোভ আছে, কিন্তু অঙ্ক জটিল
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সামসুজ্জামান সামুর বক্তব্যে “পরিবর্তন” শব্দটি বারবার আসে। কিন্তু সংখ্যার দিকে তাকালে দেখা যায়-বিএনপির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক আছে, তবে শহুরে ভোটে বিভাজন বেশি।
ধর্মভিত্তিক ও সংস্কারপন্থী ভোটের একটি অংশ বিএনপির বাইরে সরে গেছে। অর্থাৎ- বিএনপি শক্তিশালী, কিন্তু এককভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে নয়।
জামায়াত: সংখ্যায় নয়, আস্থায় উত্থান
ডেটা বিশ্লেষণে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে। জুলাই বিপ্লবের পর-জামায়াত সরাসরি পরিবর্তন ও সংস্কারের বয়ান সামনে এনেছে। কেবল বিরোধিতা নয়, শাসন সংস্কার, দুর্নীতি বিরোধী অবস্থান জোরালো করেছে।
যুব ও শিক্ষিত ভোটারের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। এটি সরাসরি বড় ভোটব্যাংকে রূপ না নিলেও, তৈরি করেছে একটি “আস্থার দোলাচল-” যেখানে ভোটার বলছে,”সবাই সমান নয়।
জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক মাহবুবার রহমান বেলাল যখন বলেন, “মানুষ বুঝতে শুরু করেছে তারা বিগত দিনে কী ভুল করেছে”-এই বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক দাবি নয়, এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
ডেটা এখানে বলে-জামায়াতের ভোট স্থিতিশীলভাবে বাড়ছে, বিশেষ করে যুব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে তারা এখন আর শুধু “প্রতিবাদী শক্তি” নয়, সংস্কারপন্থী বিকল্প।
ইসলামী আন্দোলন: ভোট কাটার ফ্যাক্টর
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ভোট সম্ভাবনা সীমিত হলেও-তারা নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ধর্মীয় ও আন্দোলনমুখী ভোট ভাগ করতে সক্ষম। ডেটা অনুযায়ী-তারা জিতবে কি না, প্রশ্ন সেটা নয়! তারা কার ভোট কমাবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সামাজিক বার্তা
তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানীর উপস্থিতি ভোটের অঙ্কে বড় প্রভাব না ফেললেও-এটি একটি সামাজিক বিবেকের সূচক। কিছু তরুণ ও মানবাধিকার সচেতন ভোটারকে প্রভাবিত করতে পারে।
শেষ হিসাব: দুর্গ ভাঙে কখন?
ইতিহাস বলে-দুর্গ ভাঙে বাইরের আঘাতে নয়, ভাঙে ভেতরের আস্থা হারালে। রংপুর সদর-৩-এ এখন সেই আস্থার হিসাব চলছে। সংখ্যা বলছে-খেলা এখনও খোলা। আর ভোটের দিনই ঠিক করবে, এটি কি দুর্গের আরেকটি রক্ষণ, নাকি রাজনীতির নতুন মানচিত্র।
Sharing is caring!