২২শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ৩রা শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

রংপুর-৪, ব্যালট বাক্সের সামনে ইতিহাস ও ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়ানো

admin
প্রকাশিত জানুয়ারি ২৬, ২০২৬, ০৯:২১ পূর্বাহ্ণ
রংপুর-৪, ব্যালট বাক্সের সামনে ইতিহাস ও ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়ানো

Manual1 Ad Code

লোকমান ফারুক, রংপুর

Manual6 Ad Code

কাউনিয়ার হাটে বাতাসে ভেসে আসে কাঁচা ধানের গন্ধ। এই ধান শুধু ফসল নয়-এটি স্মৃতি, ক্ষুধা আর ভোটের প্রতীক। পীরগাছার মাঠে আবার শাপলা ফুলের ছবি আঁকা পোস্টার উড়ছে, আর একটু দূরে লাঙ্গলের ছায়া পড়ে আছে মাটির ওপর। তিনটি প্রতীক, তিনটি ভাষা-কিন্তু মাটি একটাই।

রংপুর-৪ আসন যেন একটি রাজনৈতিক চৌরাস্তা, যেখানে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছে।

এই নির্বাচন কোনো সাধারণ আসনভিত্তিক প্রতিযোগিতা নয়। এটি একটি নীরব গণভোট-রাষ্ট্র কেমন হবে, রাজনীতি কার জন্য হবে, আর ক্ষমতা কার হাতে যাবে- এই তিন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রক্রিয়া।

ধানের শীষ: স্মৃতি, উত্তরাধিকার ও অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি

বিএনপির প্রার্থী আলহাজ্ব এমদাদুল হক ভরসার ধানের শীষ কেবল একটি প্রতীক নয়; এটি উত্তরবঙ্গের গ্রামবাংলার চিরচেনা ছবি। শীষে যেমন শত শস্যের আশা বাঁধা থাকে, তেমনি এই প্রার্থীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অতীতের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও স্মৃতির রাজনীতি।

মরহুম আলহাজ্ব রহিম উদ্দিনের নাম উচ্চারণ হলেই প্রবীণ ভোটারদের চোখে ভেসে ওঠে এক সময়ের প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের দৃশ্য।

এমদাদুল হক ভরসার প্রচারণায় সেই স্মৃতিকে নতুন করে জাগিয়ে তোলা হচ্ছে-যেন বলা হচ্ছে, যা একবার ছিল, তা আবার ফিরতে পারে।

কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, স্মৃতি যেমন শক্তি, তেমনি বোঝাও। প্রশ্ন উঠছে-এই উত্তরাধিকার কি কেবল নামের ওজন, নাকি বর্তমান বাস্তবতায় কার্যকর নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি?

Manual5 Ad Code

শাপলা কলি: প্রতিরোধ, সংস্কার ও নতুন রাষ্ট্রকল্পনা

আখতার হোসেনের শাপলা কলি মার্কা যেন শান্ত জলের ভেতর জন্ম নেওয়া এক প্রতিবাদী প্রতীক। শাপলা বাংলাদেশের জাতীয় ফুল-কিন্তু এখানে তা আর সৌন্দর্যের অলংকার নয়; এটি রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি বহন করছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অগ্রনায়ক হিসেবে তার পরিচয় তাকে একটি আলাদা রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। তার প্রচারণায় রাষ্ট্রকে দেখা হচ্ছে ভেঙে পড়া এক কাঠামো হিসেবে-যাকে সংস্কার না করলে গণতন্ত্র কেবল নামেই থাকবে।

তারুণ্যের উচ্ছ্বাস এখানে শুধু বয়সের নয়, এটি ক্ষোভের রাজনীতি। যারা পুরোনো ক্ষমতার চক্রে নিজেদের দেখতে পায় না, তাদের জন্য আখতার হোসেন যেন এক বিকল্প ভাষা।

তবে বিশ্লেষণের জায়গায় একটি কঠিন প্রশ্ন আসে- আন্দোলনের নেতৃত্ব আর সংসদীয় বাস্তবতা কি একই সমীকরণে কাজ করে? রাষ্ট্র সংস্কারের ভাষা কি ভোটের অঙ্কে রূপ নিতে পারবে?

লাঙ্গল: সংগঠন, স্থিতিশীলতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা

জাতীয় পার্টির প্রার্থী আবু নাসের শাহ্ মো. মাহবুবার রহমানের লাঙ্গল প্রতীক যেন মাটিতে গভীরভাবে বসানো একটি যন্ত্র। এটি পরিবর্তনের প্রতীক নয়, বরং স্থিতিশীলতার। দুইবারের উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে তার পরিচয় উন্নয়ন ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত।

Manual8 Ad Code

তার প্রচারণায় “শান্তি” শব্দটি বারবার ফিরে আসে—যেন রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এক ধরনের নিরাপদ আশ্রয়ের প্রস্তাব। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, স্থিতিশীলতার ভাষা অনেক সময় পরিবর্তনকামী ভোটারের কাছে নিষ্প্রাণ শোনাতে পারে।

ভোটার: নীরব বিচারক, অদৃশ্য শক্তি

এই ত্রিমুখী লড়াইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটি আসলে কোনো প্রার্থী নন-ভোটার। তারা কথা কম বলছেন, কিন্তু দেখছেন বেশি।
কাউনিয়া-পীরগাছার ভোটাররা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার পালাবদল দেখেছেন। তাই এবার তারা যেন বলছেন-“আগে দেখাও, পরে বলো।

অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ায় প্রশাসনিক প্রভাব কমার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এতে করে ভোটারদের সিদ্ধান্ত আরও অনিশ্চিত, আরও স্বাধীন।

শেষ দৃশ্য: প্রথম দৃশ্যের প্রতিধ্বনি

দিনের শেষে আবার হাট বসবে, মাঠে খেলা চলবে, কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালট বাক্স খুললেই স্পষ্ট হবে-এই জনপদ স্মৃতির রাজনীতিতে ফিরতে চায়, সংস্কারের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত, নাকি স্থিতিশীলতার পরিচিত পথে হাঁটতে চায়।

ধানের শীষ, শাপলা কলি আর লাঙ্গল-শেষ পর্যন্ত কাগজে আঁকা তিনটি চিহ্ন নয়; এগুলো তিনটি রাষ্ট্রদর্শন।

রংপুর-৪ আসনের ভোট তাই একজন সংসদ সদস্য নয়, একটি সময়ের দিকনির্দেশনা ঠিক করবে।

Manual4 Ad Code

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code