২০শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৫ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

কাস্টমসের লোহার গেট খুলছে কি না-স্বয়ংক্রিয়তার প্রতিশ্রুতি, সন্দেহ আর সময়ের হিসাব

admin
প্রকাশিত জানুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৬:২৫ অপরাহ্ণ
কাস্টমসের লোহার গেট খুলছে কি না-স্বয়ংক্রিয়তার প্রতিশ্রুতি, সন্দেহ আর সময়ের হিসাব

Manual2 Ad Code

লোকমান ফারুক

সকালটা ছিল শীতল। আগারগাঁওয়ের কংক্রিটের দেয়ালে সূর্যের আলো পড়তেই সংবাদ সম্মেলন কক্ষের বাতাসে ভাসছিল পরিচিত এক প্রশ্ন—কাস্টমস কি সত্যিই বদলাবে?

আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবস সামনে রেখে এনবিআরের মঞ্চে বসে চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান যখন “সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় কাস্টমস ব্যবস্থার” কথা বলেন, তখন তার কণ্ঠে ছিল প্রশাসনিক দৃঢ়তা, আর কক্ষে বসা সাংবাদিকদের চোখে—দীর্ঘদিনের অপেক্ষা।

Manual7 Ad Code

তিনি বললেন, নিষিদ্ধ পণ্য শনাক্ত হবে দ্রুত, বৈধ পণ্য ছাড় পাবে আরও দ্রুত। কথাগুলো সহজ-কিন্তু বাস্তবতা জটিল। কারণ এই বন্দর, এই কাস্টমস-এগুলো কেবল যন্ত্রের নয়, অভ্যাসেরও জায়গা।

চেয়ারম্যানের বক্তব্যে একাধিক স্তর। আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে আন্ডার ইনভয়েসিং ঠেকানোর উদ্যোগ-এ যেন অদৃশ্য লড়াইয়ের ঘোষণা। বছরের পর বছর ধরে কাগজে-কলমে কম দাম দেখিয়ে শুল্ক ফাঁকি-এটা কোনো গোপন গল্প নয়, বরং বন্দরের খোলা রহস্য। প্রশ্ন হলো, অ্যালগরিদম কি পারবে সেই পুরোনো ফাঁকগুলো বন্ধ করতে, যেখানে মানুষই ছিল শেষ কথা?

আরেকটি প্রতিশ্রুতি আরও বড়: জাহাজে পণ্য তোলার সঙ্গে সঙ্গেই ডিক্লারেশন, পুরো বন্দর ব্যবস্থাকে এসাইকুডার সঙ্গে যুক্ত করা। জাহাজের জট-যা বন্দরের নীরব অভিশাপ। তা কি কমবে? নাকি কেবল স্ক্রিনে জট কমে, জেটিতে থেকেই যাবে?

Manual3 Ad Code

চেয়ারম্যানের ভাষায়, স্বচ্ছতার চাবিকাঠি তথ্যের অবাধ প্রবাহ। এনবিআরের লক্ষ্য-সরকারের সব দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। কথাটা শুনতে আধুনিক, প্রায় প্রযুক্তির কবিতা। কিন্তু প্রশাসনিক বাস্তবতায় এই “যুক্ত হওয়া” মানে ক্ষমতার ভাগাভাগি। আর ক্ষমতা কেউ সহজে ছাড়ে না-এ দেশের ইতিহাস তাই বলে।

Manual6 Ad Code

এখানেই গল্পের বৈপরীত্য। একদিকে সফটওয়্যার, ডেটা, অটোমেশন-অন্যদিকে মানুষ, অভ্যাস, স্বার্থ। একদিকে দ্রুত খালাসের স্বপ্ন-অন্যদিকে সেই সব অদৃশ্য থামার জায়গা, যেখানে ফাইল থামে, সময় থামে, অর্থ থামে।

সংবাদ সম্মেলনের কক্ষে কোনো নাটকীয় ঘোষণা ছিল না। ছিল পরিমিত শব্দ, প্রশাসনিক ভদ্রতা। কিন্তু নীরবতাই কখনো কখনো সবচেয়ে জোরালো প্রশ্ন তোলে। যদি সবকিছু স্বয়ংক্রিয় হয়, তবে দায় নেবে কে? ভুল হলে-দোষ কার? মেশিন, না মানুষ?

Manual4 Ad Code

এই প্রতিবেদকের উপস্থিতি এখানে অদৃশ্য। কারণ প্রশ্নগুলো ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক। স্বয়ংক্রিয়তা যদি আসে, তা হবে আলো-অন্ধকারের বিপরীতে। কিন্তু আলো জ্বালালেই কি অন্ধকার সরে যায়?

নাকি দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে আরও গভীরে লুকিয়ে পড়ে?
আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবসের মঞ্চ থেকে ঘোষণাটি তাই কেবল প্রযুক্তির নয়, সময়েরও। সময় বলবে-এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে কতটা হাঁটা হলো, আর কতটা কেবল বক্তৃতার কাগজে রইল।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা সোজা—কাস্টমসের লোহার গেট কি সত্যিই খুলছে, নাকি কেবল তার ওপর নতুন রং লাগানো হচ্ছে? উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হবে বন্দরের কোলাহলেই। যেখানে কনটেইনারের ভেতর শুধু পণ্য নয়, লুকিয়ে থাকে রাষ্ট্রের বিশ্বাসও।

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code