৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৫শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

দিনাজপুরে মিনিবাস–অটোরিকশা সংঘর্ষ: চার প্রাণের নিস্তব্ধ শেষপ্রহর

admin
প্রকাশিত নভেম্বর ২২, ২০২৫, ০৬:৫৫ অপরাহ্ণ
দিনাজপুরে মিনিবাস–অটোরিকশা সংঘর্ষ: চার প্রাণের নিস্তব্ধ শেষপ্রহর

দিনাজপুরের দুর্ঘটনায়, বিশেষ প্রতিনিধি লোকমান ফারুকের তোলা ছবি (দৈনিক স্বাধীন ভাষা)

Manual7 Ad Code

দিনাজপুরে মিনিবাস–অটোরিকশা সংঘর্ষ: চার প্রাণের নিস্তব্ধ শেষপ্রহর

লোকমান ফারুক, বিশেষ প্রতিনিধি : দিনাজপুর নভেম্বরের দুপুর। রোদের তীব্রতা কমলেও বাতাসে ছিল ধুলো আর অস্থিরতার গন্ধ। দিনাজপুরের গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সামনের সেই পরিচিত বাঁক—যেখানে প্রতিদিন শত শত গাড়ি ছুটে যায়—আজ নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে আছে চারটি নিভে যাওয়া জীবনের শোকভার বহন করে।

Manual1 Ad Code

দৃশ্য: একটি মুহূর্ত, আর তারপর সবকিছু বদলে গেল

দশমাইল থেকে ছুটে আসা নসিব পরিবহনের বাসটি সাধারণ দিনেই যেমন গতি ধরে, আজও তেমনই এগোচ্ছিল। বিপরীত দিক থেকে আসছিল ছোট্ট একটি ইজিবাইক, তাতে পরিবার-শ্রমজীবী মানুষ—যাদের যাত্রা কখনোই খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু জীবনের মতোই প্রয়োজনীয়।

 

দিনাজপুরের দুর্ঘটনায়, বিশেষ প্রতিনিধি লোকমান ফারুকের তোলা ছবি (দৈনিক স্বাধীন ভাষা)

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছিলেন, দুই গাড়ি একে অপরের দিকে ছুটে আসছিল “যেন নদীর দুই স্রোত হঠাৎ পাথরে ধাক্কা খেয়েছে।” আর সেই ধাক্কা এতটাই প্রচণ্ড ছিল যে ইজিবাইকটি মুহূর্তেই লোহার একচেটা ভাঁজে পরিণত হয়। ঘটনাস্থলেই তিনজনের নিস্তেজ দেহ পড়ে থাকে।
একজন বৃদ্ধ ভিক্ষুক, যিনি প্রতিদিন এই মোড়ে বসতেন, কাঁপা গলায় বললেন, “চোখের সামনে মানুষ মরতে দেখলাম। আওয়াজটা ছিল যেন বজ্রপাত মাটিতে এসে পড়ল।”

হাসপাতালে আরেক মৃত্যু—বরফশীতল বেদনা

Manual8 Ad Code

গুরুতর আহত একজনকে দ্রুত দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা আর তাকে ফেরাতে পারেননি। বিকেল নামার আগেই সেই পরিবারটিও মৃত্যুর খবর পায়।

Manual2 Ad Code

হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দেখা পাওয়া গেল আহত রাশেদুলের ছোট ভাই মেহেদীকে। চোখ ভিজে,কণ্ঠ শুকনো। বললেন, ‘আমরা শুনেছি, বাঁকটা বিপজ্জনক। কিন্তু এতটা ভয়াবহ হবে ভাবিনি। ভাইভাই করে ডেকেও আর তুলতে পারলাম না।’

তদন্তের প্রশ্ন—দায় কার?

পুলিশ ঘটনাস্থল ঘিরে রেখেছে। সবকিছু নথিবদ্ধ করা হচ্ছে—ব্রেক মার্ক কোথায়, বাসের গতি কতটা ছিল, ইজিবাইকের অবস্থান কোন কোণে। দিনাজপুর সদর থানার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “এখানে প্রতিদিন যানজট আর গতি দুই-ই থাকে। তদন্তে বেরিয়ে আসবে বাসের বেপরোয়া গতি নাকি অন্য কোনো ত্রুটি সংঘর্ষের কারণ।”

ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মী রবিউল বলেন, ‘ইজিবাইকটা যেভাবে গুঁড়িয়ে গেছে, তাতে বোঝাই যায়—ধাক্কাটা ছিল অস্বাভাবিক। আমরা যখন পৌঁছাই, তখন চারপাশে শুধু চিৎকার আর ধুলোর গন্ধ।’

নিস্তব্ধ চারটি নাম—যাদের পরিচয় এখনো অপেক্ষমাণ

Manual5 Ad Code

নিহতের পরিচয় শনাক্তে কাজ চলছে। পকেট থেকে পাওয়া ছেঁড়া কাগজ, ভাঙা মোবাইল, রক্তমাখা কাপড়—সবই এখন নথিভুক্ত প্রমাণ।
একজন তদন্তকারী বলেন, ‘মৃতের নাম বের করা মানে শুধু তালিকা নয়; এর পেছনে থাকে একটি পরিবার, একটি ভাঙা ভবিষ্যৎ।’

স্থানীয়দের ক্ষোভ—এক মোড়ে বারবার একই গল্প

এ স্থানটিকে স্থানীয়রা অনেক আগেই ‘মৃত্যুর মোড়’ নাম দিয়েছেন। এক দোকানি ক্ষোভ জানিয়ে বলেন,
‘রাস্তা একটু চওড়া করলে, গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিলে—এভাবে রক্ত দিয়ে রাস্তার দাম দিতে হতো না।’
কেউ কেউ দাবি করেন, পরিবহন মালিকদের প্রভাবের কারণে চালকদের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা বন্ধ হয় না।

একটি প্রশ্ন—মৃত্যুর দায় কি কেবল চালকের?

এ দুর্ঘটনা যেন আবারও মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্র যদি সড়ক নিরাপত্তার অভিভাবক হয়, তবে তার ঘুমালে মৃত্যু অনিবার্য।

এই প্রশ্নগুলো শুধু বাতাসে ঝুলে থাকে—বারবার জীবন কেড়ে নেওয়া এসব সড়কের ওপর আসলে কার নজর আছে? আমরা কি শুধু সংখ্যার হিসাব রাখব, নাকি বাঁচতে চাওয়া মানুষের?

একই বাঁক, আরেক সন্ধ্যার প্রস্তুতি

সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলে পড়ছিল, ইনস্টিটিউটের সামনে সেই রাস্তায় আবারও যান চলা শুরু হয়েছে। জীবন কখনো থেমে থাকে না। কিন্তু রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা ভাঙা কাচ, লোহার বিকৃত গন্ধ আর মানুষের অস্থির চোখ—প্রমাণ করে দেয়, আজকের দিনটি আর স্রেফ অন্য দিনের মতো ছিল না।

মৃত্যুর চারটি ছায়া যেন এখনো বাতাসে ভাসে—যেন সতর্ক করে দেয়, বেপরোয়া গতি আর অব্যবস্থাপনা মিলে তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য খুনি, যার বিরুদ্ধে লড়াই করা জরুরি।

এখন অপেক্ষা—তদন্ত কি সত্য উন্মোচন করবে, নাকি এই ঘটনাও পুরোনো ক্ষতের মতো সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে যাবে?

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code