৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৫শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

বেকার ভাতার রাজনীতি নয়, কাজের রাজনীতি—রংপুরের রাত, দুটি কণ্ঠ, এক উত্তপ্ত মঞ্চ

admin
প্রকাশিত জানুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০২:০৬ অপরাহ্ণ
বেকার ভাতার রাজনীতি নয়, কাজের রাজনীতি—রংপুরের রাত, দুটি কণ্ঠ, এক উত্তপ্ত মঞ্চ

Manual1 Ad Code

লোকমান ফারুক, রংপুর

Manual5 Ad Code

রংপুরের ঐতিহাসিক পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে সন্ধ্যার কিছু পরে বাতাস ভারী ছিল-শীতের কুয়াশায় নয়, কথার ওজনেই। মঞ্চের সামনে জমে ওঠা মানুষের ঢল যেন কোনো নিঃশব্দ প্রশ্ন বয়ে আনছিল: এই দেশ কোন পথে যাবে?

আলো ঝলমল মঞ্চে যখন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান দাঁড়ালেন, তখন ভিড়ের ভেতর এক ধরনের থমথমে নীরবতা নেমে এলো। তিনি শুরু করলেন এমন এক বাক্যে, যা মুহূর্তেই মাঠের আবহ বদলে দিল-
“আমরা বেকার ভাতা দেবো না। বেকার ভাতা মানে হচ্ছে বেকারের কারখানা তৈরি করা।” এই বক্তব্য হাততালি আর ফিসফিসে প্রতিক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ছড়িয়ে পড়ল। ডা. শফিকুর রহমান যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই অন্য কারো ধারণার সঙ্গে সংঘাতে গেলেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, শব্দে ছিল হিসাবি স্পষ্টতা। “আমরা ভাতা নয়, মর্যাদাপূর্ণ কাজ দিতে চাই। প্রত্যেক সক্ষম নারী-পুরুষের হাতকে আমরা দক্ষ হাতে পরিণত করতে চাই।

মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ শ্রমজীবী দর্শক ফিসফিস করে বলছিলেন, “কথা ভালো, কিন্তু কাজটা কীভাবে?” এই প্রশ্নটাই যেন পুরো সমাবেশের নৈতিক কেন্দ্রবিন্দু। ডা. শফিকুর রহমান পরপর কয়েকটি তুলনা টেনে আনলেন-আফগানিস্তান, ইরান, পাকিস্তান। তারপর থামলেন। “আমরা কাউকে নকল করতে চাই না, বললেন তিনি। “আমরা গর্বের বাংলাদেশকে গর্বের বাংলাদেশ হিসেবেই গড়তে চাই। এখানে তাঁর বক্তব্যে আশ্বাসের চেয়ে সতর্কতা বেশি,”যা পারবো না, তা বলবো না।

রাজনীতির মঞ্চে এমন সংযত বাক্য বিরল। নারী অধিকার প্রসঙ্গে এসে তিনি ব্যবহার করলেন মানবিক সমীকরণ-নারী-পুরুষ নয়, মানুষ হিসেবে দেখার দর্শন। ‘মা-বোনেরা ভয় পাবেন না’ এই বাক্যটি যেন একই সঙ্গে আশ্বাস ও আবেদন। বিচার ও প্রতিহিংসার প্রশ্নে তিনি রেখা টানলেন স্পষ্টভাবে।

Manual4 Ad Code

পুরোনো ফাইল টানাটানি নয়, আবার দায়মুক্তিও নয়, আইন চলবে নিজের গতিতে। “বিচার না করে মাফ করে দেওয়া বিচার নয়, এটা বৈষম্য-এই বাক্যে হাততালির সঙ্গে সঙ্গে মাঠে শোনা গেল সম্মতির ধ্বনি।

Manual5 Ad Code

ঠিক সেই মঞ্চেই, কিছুক্ষণ পূর্বে জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেন দাঁড়ালেন ভিন্ন ভঙ্গিতে- কণ্ঠে ছিল চ্যালেঞ্জ, ভাষায় ছিল দ্বন্দ্বের রেখা।

” একটা পক্ষ আছে,’ তিনি বললেন, ‘ওরা গোলামির বাংলাদেশ বানাতে চায়।’ এই বক্তব্যে ভিড় যেন আবার জেগে উঠল। আখতার হোসেন বাংলাদেশের রাজনীতিকে দুই মেরুতে ভাগ করলেন। সংস্কার ও বিচার বনাম সংস্কারবিমুখতা। ৫ আগস্টের পর শহীদদের স্বপ্নের কথা টেনে এনে তিনি বক্তব্যে যোগ করলেন আবেগের আগুন।

দিল্লির আধিপত্যবাদ প্রসঙ্গে তাঁর কণ্ঠ ছিল আরও কঠোর। প্রতিবেশী বদলানোর কথা নয়, কিন্তু খবরদারির রাজনীতি বরদাস্ত নয়। মাওলানা ভাসানীর ভাষা ধার করে ‘সালাম’ জানিয়ে বিদায়ের হুঁশিয়ারি দিলেন তিনি।
রংপুরের উন্নয়ন বৈষম্যের বর্ণনায় আখতার হোসেনের কণ্ঠে ছিল অভিযোগের দীর্ঘশ্বাস-শিল্প নেই, চিকিৎসা নেই, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানহীন। এই অঞ্চলের বঞ্চনার গল্প যেন তাঁর বক্তব্যের মেরুদণ্ড।

Manual1 Ad Code

একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে দুই নেতা বললেন ভিন্ন ভাষায়, কিন্তু সুরটা মিলল এক জায়গায়-পুরোনো রাজনীতির প্রতি অনাস্থা। একজন বললেন বেকার ভাতার রাজনীতি নয়, কাজের রাজনীতি। আরেকজন বললেন গোলামির রাজনীতি নয়, আজাদির রাজনীতি।

মাঠ ছাড়ার সময় মনে হলো, এই সমাবেশ কেবল ভোটের আহ্বান নয়-এটা ছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের একটি খসড়া। কিন্তু সেই খসড়ায় প্রশ্ন রয়ে গেল: মর্যাদাপূর্ণ কাজ কবে, কীভাবে? সংস্কার আর বিচার কি একসঙ্গে চলতে পারবে?

পাবলিক লাইব্রেরি মাঠ তখন ধীরে ধীরে ফাঁকা হচ্ছে। আলো নিভছে, স্লোগান থেমে যাচ্ছে। কিন্তু রাতের বাতাসে ঝুলে থাকছে দুই কণ্ঠের প্রতিধ্বনি-একটি কাজের কথা বলে, অন্যটি স্বাধীনতার কথা।:মানুষই ঠিক করবে হবে, কোন প্রতিধ্বনি তারা ভবিষ্যতের দিকে বয়ে নিয়ে যাবে। সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন রংপুর ৩ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলালসহ অনেকে।

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code