১লা ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১০ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি

ফুলছড়ির চরে জলবায়ুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তরুণরা: ভাঙনের শব্দে উচ্চারিত হলো ভবিষ্যতের দাবি।

admin
প্রকাশিত নভেম্বর ১৪, ২০২৫, ১১:৫৮ অপরাহ্ণ

Manual5 Ad Code

ফুলছড়ির চরে জলবায়ুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তরুণরা: ভাঙনের শব্দে উচ্চারিত হলো ভবিষ্যতের দাবি।

লোকমান ফারুক, বিশেষ প্রতিনিধি।

ফুলছড়ি, গাইবান্ধা-সকালে ঘুম ভাঙার আগেই যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের বাতাসে যে শব্দ ভেসে আসে, তা নদীর: অনবরত ক্ষয়ের দীর্ঘশ্বাস। পশ্চিম খাটিয়ামারী চরের সেই ভাঙন-খাওয়া ভূমিতে আজ শুক্রবার সকালটা অন্য রকম। স্কুল–কলেজের কিশোর–তরুণরা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে। তাদের মুখে প্রশ্ন—’জলবায়ু বদলায়, কিন্তু বদলায় না নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা কেন?’

Manual4 Ad Code

এ যেন শুধু প্রতিবাদ নয়; ভাঙনের ওপর দাঁড়ানো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আর্তনাদ। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সহযোগিতা, সুইডেন সরকারের অর্থায়ন এবং এসকেএস ফাউন্ডেশনের ‘ক্রিয়া’ প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই কর্মসূচি ছিলো নীরব অথচ তীরের মতো তীব্র।

Manual7 Ad Code

চরের মাটিতে দাঁড়িয়ে তরুণদের সাক্ষ্য

Manual4 Ad Code

সেখানকার এক কলেজছাত্রী বলছিলেন, ‘আমরা প্রতিদিন ভাঙন দেখছি। গত বর্ষায় আমার খালাতো ভাইদের বাড়ি নদীতে মিলিয়ে গেছে। এখনো কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প নেই। শুধু প্রতিশ্রুতি—বাস্তব কিছু নেই।’ তার কথায় যেন ভাঙনের গহ্বর থেকে উঠে আসা এক ক্ষোভ।

স্থানীয় এক মাদরাসার শিক্ষক-যিনি বছরের পর বছর ছাত্রদের নিয়ে নদীভাঙন মেরামত কমিটিতে কাজ করেন—বললেন,’প্রতিবছর ২০০–৩০০ পরিবার উচ্ছেদ হয়। কিন্তু নদীশাসন, তীররক্ষা, গাছ লাগানো—সবই কাগজে বেশি, মাঠে কম।’

এ মন্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে গেলে দেখা যায়, স্থানীয় ইউনিয়ন অফিসের পরিসংখ্যান—গত তিন বছরে খাটিয়ামারী চরে অন্তত ৮৪০ পরিবার গৃহহীন হয়েছে।
‘Fridays for Future’–এর অনুপ্রেরণা, স্থানীয় বাস্তবতার চাপ; আর তরুণরা বলছিলেন, ‘আমরা এই আন্দোলন করি কারণ, আমাদের ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যাচ্ছে। দূরের ঢাকায় কেউ হয়তো টের পায় না; কিন্তু আমরা প্রতিদিন নদীভাঙনের সঙ্গে ঘুমাই।’ তারা স্লোগান তুলছিল—
“জলবায়ু নয়, বদলাক ব্যবস্থা।’ গ্রীনহাউস গ্যাসের দায় কেন আমাদের ঘরবাড়ি?’

গল্পের মতো, কিন্তু নির্মম বাস্তব।

চরের ভেতর হাঁটলে দেখা যায়—পানিতে আধাখাওয়া পিলার, একপাশে বালুভাঙা দেয়াল, দূরে নারীর কান্না।
একজন নামহীন সূত্র জানালেন, ‘এই এলাকায় পাঁচটি বড় প্রকল্পের কথা শুনেছি; তিনটি শুরুই হয়নি, বাকি দুইটি মাঝপথে থেমে গেছে।’
প্রশ্ন জাগে—দাতাদের অর্থ, সরকারি বরাদ্দ আর মাঠের বাস্তবতার মধ্যে এত ফাঁক কেন?

বিশ্লেষকের চোখে জলবায়ুর ঝুঁকি

রংপুর অঞ্চলের একজন জলবায়ু গবেষক বললেন,
‘যমুনা–ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় নদীভাঙন এখন আর মৌসুমি নয়, এটি স্থায়ী সংকট। স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানো, আগাম সতর্কতা, উপযুক্ত বাঁধ এবং বিকল্প জীবিকায় বিনিয়োগ ছাড়া ভবিষ্যৎ বাঁচানো কঠিন।’ তার মতে, তরুণদের এই প্রতিবাদ নীতিনির্ধারকদের প্রশ্নবিদ্ধ করে—
‘যখন সংকট বাড়ছে, তখনও কেন নেই সমন্বিত পরিকল্পনা?’

এ যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্তব্ধ চিৎকার

তরুণদের শেষ মন্তব্যটি প্রতিবেদকের নোটবুকে দাগ কেটে দিল: ‘এটি শুধু প্রতিবাদ নয়; এটি আমাদের ভবিষ্যৎ রক্ষার সংগ্রাম।’

প্রতিবেদকের অদৃশ্য ভাবনা—এই চরের ধুলো, নদীর ঢেউ, ভাঙনের ক্ষত কি সরকারের ফাইলে কখনো ঠিক মতো পৌঁছায়? নাকি এসব কণ্ঠস্বর বারবার হারিয়ে যায় প্রশাসনিক অনাগ্রহে?

Manual2 Ad Code

সকালের সেই সারি—তরুণদের চোখে প্রতিবাদের আগুন আর পায়ের নিচে অনিশ্চিত মাটি। যমুনা–ব্রহ্মপুত্রের দমবন্ধ করা বাতাসে তাদের কণ্ঠস্বর ভেসে বেড়াচ্ছে এখনো: ‘জলবায়ু নয়… বদলাক ব্যবস্থা।’

ফুলছড়ির চরের সেই দৃশ্যপটেই যেন ধরা আছে বাংলাদেশের জলবায়ু–সংকটের বিকট সত্য—
পরিবর্তন আসবেই, প্রশ্ন শুধু—নীতিনির্ধারকদের জাগতে আর কত ভাঙন লাগবে?

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code