১০ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৫শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

পীরগাছায় লাইনম্যান পেটানো: অভিযোগ আছে, মামলা নেই

editor
প্রকাশিত মার্চ ৩১, ২০২৬, ০৯:২০ অপরাহ্ণ
পীরগাছায় লাইনম্যান পেটানো: অভিযোগ আছে, মামলা নেই

Manual7 Ad Code

পীরগাছায় লাইনম্যান পেটানো: অভিযোগ আছে, মামলা নেই

লোকমান ফারুক, রংপুরঃ রংপুরের পীরগাছায় একটি সকাল শুরু হয়েছিল নিয়মমাফিক কাজ দিয়ে। শেষটা হয়েছে বিশৃঙ্খলায়। মাঝখানে ছিল কয়েক মিনিটের উত্তাপ—যেখানে দায়িত্ব আর ক্ষোভ মুখোমুখি দাঁড়ায়, আর হারিয়ে যায় সংযম।
সোমবার সকালে কান্দি বাজার এলাকায় বকেয়া বিদ্যুৎ বিল আদায়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে যায় রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর একটি দল। এমন অভিযান নতুন নয়। কিন্তু সেদিনের মতো প্রতিক্রিয়া সবসময় হয় না। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ—পূর্ব ঘোষণা ছাড়া সংযোগ কাটা হয়েছে। অভিযোগ সত্য কি না, সেটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই হয়নি। কিন্তু অভিযোগটাই যথেষ্ট ছিল উত্তেজনার আগুন ধরাতে।

বিতণ্ডা শুরু হয়। কথার সঙ্গে জড়ায় ভিড়। ভিড়ের সঙ্গে আসে সাহস, কখনো অযৌক্তিক। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। লাইনম্যান রাকিবুল ইসলামকে লক্ষ্য করে হামলা হয়—হঠাৎ, দ্রুত, এবং সম্মিলিতভাবে। অন্য কর্মীরা সরে যান। কেউ থামায়নি, কিংবা থামাতে পারেনি। রাকিবুল ইসলাম পরে বলেন, “একটি পানের দোকানের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর দোকানদার ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ‘গালিগালাজ করতে করতে লোক জড়ো করেন। তারপর কয়েকজন মিলে আমার ওপর হামলা চালায়’—বলছিলেন তিনি,

Manual6 Ad Code

এজাহারে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা শুধু মারধরই করেননি; সরকারি কাজে বাধা দিয়েছেন এবং একটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়েছেন। সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে—লাভলু, রুবেল, আতিয়ার রহমান, আজহারুল ইসলাম, রনজিত কুমার অশোক, মাহবুব আলম ও চাঁন মিয়া। ঘটনার পর আহত লাইনম্যানকে পীরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র পাঠানো হয়। চিকিৎসার নথি এখন এই ঘটনার নীরব সাক্ষী। কিন্তু আরেকটি নথি—এজাহার—এখনো কাগজেই আটকে আছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পীরগাছা জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আশরাফুল ইসলাম বলেন, “সোমবার রাতেই থানায় এজাহার দেওয়া হয়েছে।’ এখনো মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি’—তার কণ্ঠ ছিল সংযত এবং হতাশা।

Manual3 Ad Code

পীরগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ একেএম মহিব্বুল ইসলাম বলছেন ভিন্ন ভাষায়। “অভিযোগটি তদন্তাধীন। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে”—একটি পরিচিত বাক্য, যা অনেক ঘটনার মতো এখানেও সময় চায়, বা সময় নেয়। সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন কর্মী যদি জনতার হাতে মার খায়, সেটি কি কেবল ‘দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা’? নাকি এটি আইনের শাসনের এক নীরব ক্ষয়—যেখানে ভিড়ের তাৎক্ষণিক রায় আইনের প্রক্রিয়াকে ছাপিয়ে যায়?

আবার উল্টো দিকেও প্রশ্ন আছে। যদি সত্যিই পূর্ব ঘোষণা ছাড়া সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়ে থাকে, তবে সেটি কি প্রশাসনিক শৈথিল্য, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যাস?
জনগণের ক্ষোভ কি তখন পুরোপুরি অযৌক্তিক থাকে?
এই ঘটনার কেন্দ্রে আছে দুই পক্ষ—একজন লাইনম্যান, যিনি নিয়ম বাস্তবায়ন করছিলেন; আর একদল মানুষ, যারা নিজেদের ক্ষতির আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ হয়েছিল। মাঝখানে ছিল না কোনো কার্যকর সংলাপ, ছিল না তাৎক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ।
আইন বলে, অভিযোগ এলে তা নথিভুক্ত হবে, তদন্ত হবে, বিচার হবে। বাস্তব বলে, সবকিছু সবসময় সেই ক্রমে এগোয় না। পীরগাছার এই ঘটনাও এখন সেই মাঝপথে দাঁড়িয়ে—এজাহার আর মামলার মাঝখানে, অভিযোগ আর প্রমাণের মাঝখানে, দায়িত্ব আর জবাবদিহির মাঝখানে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকে যায়—এই ঘটনার বিচার কি আইনের পথে এগোবে, নাকি এটিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি ‘ঘটনা’ হয়ে ফাইলের ভাঁজে চাপা পড়ে যাবে?

Manual6 Ad Code

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code