৫ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২২শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

ধূসর বিকেল থেকে স্বচ্ছ ভোর: এক বিদায়ের অন্তরালে রাষ্ট্রের আয়না

editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬, ১০:২৫ অপরাহ্ণ
ধূসর বিকেল থেকে স্বচ্ছ ভোর: এক বিদায়ের অন্তরালে রাষ্ট্রের আয়না

Manual3 Ad Code

ধূসর বিকেল থেকে স্বচ্ছ ভোর: এক বিদায়ের অন্তরালে রাষ্ট্রের আয়না

লোকমান ফারুকঃ রাজধানীর আকাশে রোদের চেয়ে ছায়াই যেন বেশি ঘন। তেজগাঁওয়ের প্রশাসনিক প্রাঙ্গণে ঢুকলে বোঝা যায় এটি কেবল একটি বিদায়ী অনুষ্ঠান নয়; এটি এক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি, আরেক অধ্যায়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা রাষ্ট্রের নীরব আত্মজিজ্ঞাসা।

মঞ্চে উঠলেন মুহাম্মদ ইউনূস। বয়সের ভার কাঁধে, অথচ কণ্ঠে ক্লান্তি নেই বরং এক ধরনের স্থিরতা, যা ঝড় পেরোনো নাবিকের চোখে দেখা যায়। হলরুমে পিনপতন নীরবতা। তিনি সম্বোধন করলেন সহকর্মীরা”।
ক্ষমতার অলংকার ঝেড়ে ফেলে এই একটি শব্দেই তিনি যেন নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন। তিনি বললেন, “আমি ক্ষমতার লোভে আসিনি, এসেছিলাম আপনাদের আহ্বানে। এই চেয়ারটি আমার কাছে কোনো সিংহাসন ছিল না, ছিল এক বিশাল আমানত। আজ সেই আমানত আমি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছি। আমার বয়স হয়েছে, শরীরের শক্তি হয়তো কমেছে, কিন্তু বাংলাদেশের তারুণ্যের ওপর আমার যে বিশ্বাস, তা আজ হিমালয়ের চেয়েও অটল।”

কথাগুলো কেবল ভাষণ নয়; এগুলো দায়মুক্তিরও ঘোষণা নয়, দায় হস্তান্তরের মুহূর্ত। রক্তমাখা আগস্ট থেকে ব্যালটের ফেব্রুয়ারি। স্মৃতির পর্দা সরালে ফিরে আসতে হয় ২০২৪-এর উত্তাল আগস্টে। রাজপথে তখন বারুদের গন্ধ, বাতাসে অনিশ্চয়তার কুয়াশা ছাত্র-জনতার রক্তে ভেজা দিনগুলোতে রাষ্ট্র যেন নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছিল। সেই অন্ধকার বিকেলে তিনি দেশে ফিরেছিলেন একজন অর্থনীতিবিদ, নোবেলজয়ী, কিন্তু তার চেয়েও বড় পরিচয়: সংকটকালে আহূত অভিভাবক।

১৮ মাস। সময় হিসেবে অল্প, কিন্তু ইতিহাসের ঘড়িতে দীর্ঘ। এই সময়টুকুতে তিনি নিজেকে প্রশাসনিক কুশীলবের চেয়ে বেশি দেখিয়েছেন নৈতিক বার্তাবাহক হিসেবে। বিচার বিভাগ, পুলিশ, নির্বাচন ব্যবস্থায় সংস্কারের কথা বলেছেন; সব শেষ করতে পারেননি স্বীকারও করেছেন। “সব সংস্কার শেষ করতে পারিনি, কিন্তু বীজ বুনে দিয়েছি।” রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অভিধানে এটিকে বলে কাঠামোগত পুনরারম্ভ। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল ভাঙা আয়না জোড়া লাগানোর চেষ্টা, যেখানে প্রতিটি ফাটলে জমে ছিল দীর্ঘদিনের অবহেলা।

রাজনীতির ইতিহাসে বিদায় সাধারণত দুই রকম একটি ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার, আরেকটি ক্ষমতা ছাড়ার অনিচ্ছুক নাটক। এই বিদায় তার কোনোটিই নয়। এখানে ছিল এক ধরনের নীরব আত্মসমর্পণ ক্ষমতার কাছে নয়, গণতন্ত্রের কাছে। তিনি কর্মকর্তাদের বললেন, “আগামীকাল থেকে নতুন সরকার আসবে। ব্যক্তি বদলে যাবে, কিন্তু আপনারা রাষ্ট্রের সেবক। দয়া করে এই নতুন জন্ম নেওয়া বাংলাদেশকে আর কোনোদিন দুর্নীতির অন্ধকারে তলিয়ে যেতে দেবেন না। জুলাই-আগস্টের সেই শহীদদের রক্তের প্রতি আমাদের যে ঋণ, তা কেবল সততা দিয়েই শোধ করা সম্ভব।”

Manual2 Ad Code

এই বাক্যগুলো প্রশাসনিক নির্দেশ নয়; এটি ছিল নৈতিক আল্টিমেটাম। যেন তিনি বলছেন রাষ্ট্র কাগজে-কলমে নয়, চরিত্রে টিকে থাকে। একসময় এই দেশ দেখেছে ক্ষমতার প্রস্থান কলঙ্কে ঢেকে যেতে। আর আজ, একই রাষ্ট্র দেখল একজন প্রধান উপদেষ্টার বিদায় চোখের জলে। ইতিহাসের রসায়নে এ এক তীব্র বৈপরীত্য একদিকে পলায়ন, অন্যদিকে প্রস্থান; একদিকে দায় এড়ানো, অন্যদিকে দায় হস্তান্তর।

একটি স্বচ্ছ ভোট অন্তত সেই দাবি ছিল তাঁর দীর্ঘ প্রচেষ্টার দৃশ্যমান ফল। সমালোচকরা বলবেন, অনেক কিছু অসম্পূর্ণ। সমর্থকেরা বলবেন, শূন্য থেকে শুরু করা পথের প্রথম মাইলফলক। সত্যি হয়তো মাঝামাঝি কোথাও দাঁড়িয়ে আছে। ভাষণ শেষ। করতালির বদলে নেমে এল অদ্ভুত নীরবতা। তিনি একে একে হাত মেলালেন পিয়ন থেকে সচিব। কোনো প্রোটোকলের কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল বিদায়ের সহজ মানবিকতা। যেন প্রশাসনিক প্রাসাদের দেয়ালগুলোও বুঝে ফেলেছে একটি অধ্যায় শেষ হলো। জানালার বাইরে ধূসর আকাশ। ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির চোখে কি জল ছিল? নিশ্চিত বলা যায় না। কিন্তু ইতিহাস জানে এই মুহূর্তটি ছিল আবেগের চেয়ে বড়; এটি ছিল দায়বোধের প্রতীক।

Manual1 Ad Code

রাষ্ট্র কি কেবল ব্যক্তিনির্ভর? একজন মানুষ কি সত্যিই কাঠামো বদলাতে পারেন? নাকি তিনি কেবল সময়ের স্রোতে এক অস্থায়ী সেতু, যার কাজ দুই তীরকে যুক্ত করা? এই প্রশ্নগুলো এখন আমাদের। কারণ তিনি বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু প্রশ্ন রেখে গেছেন। সততার রাজনীতি কি টিকে থাকবে? প্রশাসন কি আমলাতন্ত্রের পুরোনো ছকে ফিরে যাবে, নাকি নতুন বীজ অঙ্কুরিত হবে?

Manual1 Ad Code

সোমবারের ধূসর আকাশ ধীরে ধীরে সন্ধ্যার দিকে গড়িয়েছে। মঙ্গলবার নতুন প্রধানমন্ত্রী শপথ নেবেন। রাষ্ট্রযন্ত্র চলবে তার নিজস্ব গতিতে। কিন্তু ১৬ ফেব্রুয়ারির এই বিকেলটি ইতিহাসের নীরব পাতায় রয়ে যাবে যেদিন একজন প্রবীণ অর্থনীতিবিদ ক্ষমতার মসনদ ছেড়ে গণতন্ত্রের হাতে আমানত তুলে দিলেন।
শুরুতে যে প্রশ্ন ছিল আকাশ কি ধূসর, নাকি আমাদের মন?শেষে এসে মনে হয়, হয়তো দুটোই। কিন্তু ধূসরতার মধ্যেই তো ভোরের ইঙ্গিত থাকে।

মুহাম্মদ ইউনূস চলে গেলেন প্রশাসনিক কার্যালয় থেকে, কিন্তু রেখে গেলেন একটি বাক্য সততা ছাড়া রাষ্ট্র টেকে না। ইতিহাসের আদালতে এটাই হয়তো তাঁর পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী সাক্ষ্য।

Manual3 Ad Code

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code