৫ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২২শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

মসজিদের মিম্বর থেকে সংসদে: পীরগঞ্জের নীরব রূপান্তর

editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ০৩:৪৪ অপরাহ্ণ
মসজিদের মিম্বর থেকে সংসদে: পীরগঞ্জের নীরব রূপান্তর

Manual3 Ad Code

মসজিদের মিম্বর থেকে সংসদে: পীরগঞ্জের নীরব রূপান্তর

লোকমান ফারুক, রংপুরঃ ভোররাত। কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আলো জ্বলছে। ফলাফল ঘোষণার আগে-পরে ফিসফাস, ফোনকল, হিসাব মিলিয়ে দেখা সংখ্যা কখনও কেবল সংখ্যা থাকে না, কখনও তা হয়ে ওঠে একটি জনপদের মনস্তত্ত্বের প্রতিচ্ছবি।

এই নির্বাচনে রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে বিজয়ী হয়েছেন ৫১ বছর বয়সী মাওলানা মো. নুরুল আমিন। জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ এনামুল আহসান শুক্রবার ভোর রাতে তাঁকে বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করেন। জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ২০ হাজার ১২৮ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির জেলা আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৭০৩ ভোট। ব্যবধান ২ হাজার ৪২৫।

Manual1 Ad Code

সংখ্যাটি ছোট নয়। আবার অপ্রতিরোধ্যও নয়।

Manual4 Ad Code

মিম্বরের মানুষ। মাওলানা নুরুল আমিন পেশায় ইমাম ও খতিব। পীরগঞ্জ সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ মজলিসুল মুফাসসিরিনের কেন্দ্রীয় কমিটির জেনারেল সেক্রেটারি। চতরা ইউনিয়নের আলতাব নগর জামে মসজিদে তাঁর নিয়মিত ইমামতি যে মসজিদটি প্রবাসী অর্থায়নে নির্মিত, ব্যয় প্রায় ১৪ কোটি টাকা। ভোটের পরদিনও তিনি সেই মসজিদে নামাজ পড়িয়েছেন। মুসল্লির ঢল নেমেছে। কেউ বলছিলেন, “হুজুর এখন এমপি।” কেউ সংশোধন করছিলেন, “না, তিনি আগে আমাদের ইমাম।”

এই দ্বৈত পরিচয় ধর্মীয় নেতা ও জনপ্রতিনিধি পীরগঞ্জের রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

একটি জোট, একাধিক প্রত্যাশা

১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। প্রকাশ্যে তিনি বলেছেন, “আমি এখন শুধু ১১ দলের নই, পীরগঞ্জের সব মানুষের প্রতিনিধি।” বক্তব্যটি কূটনৈতিক, প্রয়োজনীয়ও। কারণ তাঁর ভোট এসেছে কেবল দলীয় সমর্থকদের কাছ থেকে নয়; এসেছে ব্যক্তিগত পরিচিতি, ধর্মীয় প্রভাব এবং স্থানীয় নেটওয়ার্কের জটিল সমন্বয়ে।
পীরগঞ্জে কথা বলে জানা যায়, অনেক ভোটার দল নয়, মানুষ দেখে ভোট দিয়েছেন। এক দোকানদার বললেন, ” “হুজুরকে আমরা বহু বছর ধরে চিনি। বিয়ে-জানাজা, ওয়াজ সবখানে ছিলেন।” আরেকজন বললেন, ” “রাজনীতি আলাদা বিষয়। সংসদে গিয়ে কী করবেন, সেটাই দেখার।”

ধর্ম ও রাষ্ট্রের সীমানা

সংসদ ভবন আর মসজিদের মিম্বর দুটি আলাদা পরিসর। একটিতে নীতিনির্ধারণ, অন্যটিতে নৈতিক দিকনির্দেশ। কিন্তু যখন একই ব্যক্তি দুই মঞ্চে দাঁড়ান, তখন প্রশ্ন ওঠে কোন পরিচয়টি প্রাধান্য পাবে?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় নেতাদের অংশগ্রহণ নতুন নয়। কিন্তু স্থানীয়ভাবে সক্রিয় ইমাম থেকে সরাসরি সংসদ সদস্য হওয়ার ঘটনা পীরগঞ্জে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর সমর্থকেরা বলছেন, “ধর্মভীরু মানুষ দুর্নীতি করবে না।” সমালোচকেরা পাল্টা জিজ্ঞেস করছেন, “রাষ্ট্র কি ধর্মীয় বয়ানের মাধ্যমে পরিচালিত হবে?” এই প্রশ্নগুলো এখনো নীরব। কিন্তু স্থায়ী।

Manual7 Ad Code

পীরগঞ্জের প্রেক্ষাপট

পীরগঞ্জের রাজনৈতিক স্মৃতিতে রক্তের দাগ আছে। শহীদ আবু সাঈদের নাম উচ্চারিত হয় এখনো। সেই জনপদে একজন ধর্মীয় বক্তার বিজয় কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি সামাজিক অভিমুখেরও ইঙ্গিত।
১৯৭৪ সালের ১ মার্চ জন্ম নেওয়া নুরুল আমিন দুরামীতিপুর গ্রামের সন্তান। বাবা মাওলানা আজিজুর রহমান, মা আমেনা খাতুন। পরিবারিক ধর্মীয় পরিবেশ, মাদ্রাসা শিক্ষা, ওয়াজ মাহফিলে জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে তিনি জনপরিচিত মুখে পরিণত হন। রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি সাম্প্রতিক হলেও সামাজিক পরিসরে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই দৃশ্যমান।

Manual6 Ad Code

ভোটের অঙ্কের বাইরে

২ হাজার ৪২৫ ভোটের ব্যবধান। এটি জয়ের স্বস্তি দেয়, কিন্তু সতর্কতাও তৈরি করে। কারণ প্রায় সমানসংখ্যক মানুষ অন্য প্রার্থীকে বেছে নিয়েছেন। সংসদে যাওয়ার পথে এই বাস্তবতা তাঁর প্রথম রাজনৈতিক পাঠ হতে পারে। নির্বাচনকে তিনি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য বলেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। বক্তব্যে ধর্মীয় কৃতজ্ঞতাও ছিল”আল্লাহর রহমত ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়।” ধর্মীয় ভাষা ও রাজনৈতিক ভাষা দুটিই তাঁর কথায় পাশাপাশি চলে।

সামনে যে প্রশ্ন

সংসদে তাঁর ভূমিকা কী হবে? তিনি কি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো এই বাস্তব ইস্যুগুলোকে অগ্রাধিকার দেবেন? নাকি নৈতিক ও আদর্শিক প্রশ্নগুলোই প্রাধান্য পাবে? পীরগঞ্জের এক তরুণ ভোটার বললেন, “আমরা উন্নয়ন চাই। রাস্তা, হাসপাতাল, কাজ।” পাশে দাঁড়ানো বয়স্ক একজন যোগ করলেন, “আর নৈতিকতা।” এই দুই চাহিদার মধ্যে সেতুবন্ধন করাই হবে নতুন সংসদ সদস্যের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

মসজিদের মিম্বর থেকে সংসদে যাওয়ার পথটি প্রতীকী। এটি কেবল একজন ব্যক্তির যাত্রা নয়; এটি সমাজের এক অংশের আস্থার প্রতিফলন। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা কেবল আস্থা দিয়ে চলে না চলে নীতি, সমঝোতা, আইন এবং বহুত্বের স্বীকৃতির ওপর।

মাওলানা নুরুল আমিন এখন পীরগঞ্জের সব মানুষের প্রতিনিধি। প্রশ্ন হলো তিনি কি তাঁর মিম্বরের ভাষাকে সংসদের ভাষায় রূপান্তর করতে পারবেন? নাকি সংসদ একদিন মিম্বরের সম্প্রসারিত রূপ হয়ে উঠবে?
এই উত্তরের অপেক্ষায় আছে পীরগঞ্জ। আর হয়তো আরও অনেকে।

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code