১লা ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১০ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি

ভূমিকম্পের পর মানুষের মনে নাড়া: আজহারীর বার্তা যে প্রশ্ন তুলে দিল

admin
প্রকাশিত নভেম্বর ২১, ২০২৫, ০৮:১৮ অপরাহ্ণ
ভূমিকম্পের পর মানুষের মনে নাড়া: আজহারীর বার্তা যে প্রশ্ন তুলে দিল

Manual2 Ad Code

নিউজ ডেস্ক

রংপুর সকালের আকাশ তখনো পুরোপুরি উজ্জ্বল হয়নি। রাজধানীর রাস্তায় লোকজনের হালকা আনাগোনা, অফিসগামীদের তাড়াহুড়ো, দোকান খোলার প্রস্তুতি—সবকিছুই চলছিল স্বাভাবিক গতিতে। ঠিক সেই সময়, ১০টা ৩৮ মিনিটে, শহরের বুকের নিচে যেন একটা অদৃশ্য জন্তু ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।

মুহূর্তেই ভবনগুলো কেঁপে উঠল। প্রথমে হালকা, তারপর একটু ভারি—যেন কোনো অচেনা শক্তি সারা শহরের শিরায় রোমাঞ্চের মতো দৌড়ে গেল। মানুষ থমকে দাঁড়াল, কারও হাতে থাকা কফির কাপ ছিটকে উঠল, কেউ দোতলা বারান্দা থেকে নিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে গেল আতঙ্কভরা দৃষ্টিতে।

কয়েক সেকেন্ডের কাঁপুনি। কিন্তু সেই সেকেন্ডগুলো যেন দীর্ঘ একটি প্রশ্নের মতো ছড়িয়ে রইল পুরো সকালে। ঘটনার নথি: কোথা থেকে এল এই কাঁপুনি? আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের নথি বলছে—রিখটার স্কেলে মাত্রা ৫.৭। উৎপত্তিস্থল—নরসিংদীর মাধবদী, ঢাকা থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার উত্তরে। একজন কর্মকর্তা ফোনে নিশ্চিত করলেন, “কম্পন ছিল হঠাৎ, দ্রুত, আর কেন্দ্র ছিল খুব কাছেই। তাই মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়ানো স্বাভাবিক।”

Manual2 Ad Code

এ রিপোর্ট লিখতে লিখতেই মনে পড়ছিল—শহরের কাচের জানালাগুলো কীভাবে হালকা দুলে উঠেছিল, যেন অদৃশ্য হাত নেড়ে দিয়ে গেছে। কম্পন থামার পর আরো বড় আরেকটি স্রোত দেখা গেল—ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব। হাজারো পোস্ট, ভিডিও, লাইভ স্ট্যাটাস।

Manual5 Ad Code

আতঙ্ক, সতর্কবার্তা, দোয়া—সব মিশে যেন এক অস্থির নদী। এই বিশৃঙ্খলার মাঝেই শান্ত স্বরে একটি পোস্ট ছড়িয়ে পড়ল—ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারীর বার্তা। তার ফেসবুক পোস্টটি পড়লে মনে হয়, তিনি শুধু ভূমিকম্প নয়—মানুষের জীবনের নীরব সত্যটাকেই ঝাঁকিয়ে দিতে চেয়েছেন। তিনি লিখেছেন—”ভেবে দেখেছেন কি? আজ ভূমিকম্পের তীব্রতা যদি আরও ভয়াবহ হতো, খুব কম মানুষেরই শেষ আমল হতো ফজরের নামাজ।

Manual2 Ad Code

সেই তালিকায় আপনি থাকতেন তো?” তারপরই সেই তীক্ষ্ণ প্রশ্ন—” উত্তর ‘না’ হলে, এখনও শুধরে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।” আজহারীর পোস্ট কেবল ধর্মীয় বক্তব্য নয়; এটি মানুষের মনস্তত্ত্বে এক ধরনের কম্পন তৈরি করেছে। ফেসবুকে তার পোস্টের নিচে এক তরুণ লিখেছেন— “ভাই’ এক মুহূর্তে জীবন থেমে যেতে পারে—এটা আজ সত্যি বুঝলাম।” আরেকজনের মন্তব্য—” কাঁপুনি কয়েক সেকেন্ড, কিন্তু মনে প্রশ্নটা অনেক গভীর।”

এই মন্তব্যগুলো পড়ে মনে হয়—ভূমিকম্প শুধু মাটি নাড়িয়ে দেয় না; মানুষের বিশ্বাস, ভয়, দায়বদ্ধতাকেও নাড়িয়ে দেয়। আজহারীর বার্তায় সূরা মুলকের সেই আয়াত— “তোমরা কি নিশ্চিত হয়ে গেছো যে, যিনি আসমানে রয়েছেন, তিনি তোমাদেরকে জমিনে ধ্বসিয়ে দেবেন না?” —এ যেন শহরের দুলে ওঠা দেয়ালের চেয়েও বেশি তীব্র হয়ে ফিরে আসে পাঠকের মনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বৈশিষ্ট্য—কেউ প্রথমে ভয় পোষে, কেউ তা প্রশমিত করে। কেউ ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে, কেউ আবার প্রশ্ন তোলে।

Manual4 Ad Code

একজন সাবেক সাইবার মনিটরিং কর্মকর্তা আমাকে বললেন—”বিপর্যয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সত্যি-অর্ধসত্যি দিয়ে ভরে যায়। আজহারীর পোস্টটি প্রভাবশালী ছিল, কারণ তা আতঙ্ক নয়—অন্তর্দৃষ্টি জাগায়।” এ বক্তব্যে গভীর সত্য লুকিয়ে মানুষ ঘটনা নয়, ঘটনার ব্যাখ্যাতেই বেশি নড়ে ওঠে। প্রতিবেদকের প্রশ্ন—এই কম্পন কি সতর্কবার্তা? ভূমিকম্পের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সহজ—মাধবদীর সক্রিয় ফল্ট লাইনে চাপ সঞ্চিত ছিল, যা ভেঙে সাময়িক কাঁপুনি তৈরি করেছে। কিন্তু মানুষের মনের ব্যাখ্যা আরও জটিল—এক সেকেন্ডের দুলুনি তাকে জীবনের ভঙ্গুরতার কথা মনে করিয়ে দেয়।

আজহারীর সেই প্রশ্ন— “আপনি কি প্রস্তুত ছিলেন?” —মানুষকে নাড়া দেয় ঠিক যেমন ভূমিকম্পের কম্পন মাটিকে নাড়িয়ে দেয়। শহর আবার শান্ত, কিন্তু প্রশ্নটি বাতাসে ভাসছে ভূমিকম্পের পর শহর আবার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে গেছে। মেট্রোরেলে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, ট্রাফিক সিগনালে ভিড়, বাজারে দরকষাকষি—সব আবার আগের মতো। কিন্তু দিনের শেষে, এই শহরের দেয়াল আর মানুষের মন—দুটোই আজ একটু নড়ে উঠেছে।

ভূমিকম্প থেমে গেছে, কিন্তু আজহারীর প্রশ্ন— “আপনি সময় থাকতে নিজেকে ঠিক করছেন তো?” শুরুতে যে অদৃশ্য শক্তি শহরকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, শেষেও যেন সেই অদৃশ্য সত্যই ফিরে আসে—মাটি যেমন কাঁপে, মানুষের মনও তেমন কাঁপে। আর সেই কাঁপুনি কখনো কখনো মনে করিয়ে দেয়—জীবন খুবই সামান্য, তবু গভীর।

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code