সৌদি প্রবাসে নির্যাতনের পর দেশে ফেরা নারীদের কষ্ট
আনোয়ার হোসেন , বিশেষ প্রতিনিধিঃ বরিশালের এক গৃহকর্মী নারী সৌদি আরব থেকে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে দেশে ফিরে এসেছে। চারবার হাতবদলের পর শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া এই নারী বর্তমানে রাজধানীর আশকোনা এলাকার ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে রয়েছেন। তিনি জানান, সৌদিতে কাজ করতে গিয়ে কোনো বেতন পাননি, খেতেও পাননি এবং শুধুমাত্র নির্যাতন সহ্য করেছেন। ক্ষুধার জ্বালায় তিনি ডাস্টবিন থেকেও খাবার কুড়িয়ে খেয়েছেন। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে জানতে পারেন, তিন মাসের বেতন আগেই নিয়োগকর্তার কাছে পরিশোধ করা হয়েছে, কিন্তু তিনি কিছুই পাননি।
অন্যদিকে ১৩ দিন আগে সৌদি থেকে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় দেশে ফেরা আরেক নারীকে পাসপোর্ট ও পরিচয়পত্র না থাকার কারণে স্বজনরা চিনতে পারছিলেন না। পরে পুলিশ ও ব্র্যাকের উদ্যোগে পরিচয় শনাক্ত করে পরিবারের হাতে তুলে দেন।
২০২০ সালে লিখেছিলাম:
সম্প্রতি সৌদি থেকে কিশোরীর মরদেহ এসেছে। কাগজপত্রে আত্মহত্যা বলা হলেও আত্মহত্যা না। সারা শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন। ১৩ বছরের একজন কিশোরী কীভাবে বিদেশে যায় কাজ করতে, তাও সৌদির মতো মেয়েদের জন্য অনিরাপদ দেশে?
গত আগস্টেই সৌদিতে মৃত্যু হয় ১৪ বছরের কিশোরী কুলসুমের। যে বাড়িতে কাজ করতো সেই বাড়ির নিয়োগকর্তা ও তার ছেলে মেরে দুই হাত-পা ও কোমর ভেঙে দিয়েছে। একটি চোখ নষ্ট করে দিয়েছে। তারপর ওই অবস্থায় রাস্তায় ফেলে গেছে। অক্টোবরে সৌদি থেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দেশে ফেরেন খুলনার রুনু বেগম।
করোনার ৮ মাসে সৌদি আরব থেকে ২২ জন, লেবানন থেকে ১৪, জর্ডান থেকে ১১, ওমান থেকে ৭, আরব আমিরাত থেকে ৪জন নারী কর্মীর মরদেহ এসেছে। গত চার বছরে সৌদি আরব থেকে ১৭৫জনের লাশ এসেছে। মৃতের অধিকাংশের শরীরে অকথ্য অত্যচারের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
সৌদি আরব থেকে ফেরা ফরিদপুরের সুফিয়া বেগম বলেন, ‘অনেক সময় নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে অনেকে আত্মহত্যা করেন। নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে আমি নিজের গলায় নিজে ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিলাম।’
‘আমিতো দেহ ব্যবসা করতে যাই নাই। আমিতো গেছি কামের জন্য, কাম করমু, ভাত খামু, পয়সা ইনকাম কইরা পোলাপান মানুষ করমু। কষ্টের লাইগা গেছি।’—সৌদিফেরত এক নারী গৃহকর্মীর কথা।
২০১৮ সালে লিখেছিলাম:
শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে গত ৬ মাসে মুসলমানদের পবিত্রভূমি সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন এক হাজার বাংলাদেশি ‘মুসলিম’ নারী। ঘরে ফেরা নারীরা দেশে ফিরে সরকারের কোনো সংস্থাকে পাশে পাচ্ছে না। অনেকে ফিরে যেতে পারছে না পরিবারেও। পরিবার নির্যাতনের শিকার নারী গ্রহণ করছে না। সামাজিকভাবেও হেয় হতে হচ্ছে তাদের।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একে অন্যের উপরে দোষ চাপাচ্ছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক বলছেন এ দায় রিক্রুটিং এজেন্সিকে নিতে হবে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বলছে তারা এর জন্য দায়ী নয়। দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে নারী গৃহকর্মীরা সৌদি আরবে গেছেন। তারা বলছে, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব রয়েছে।
কিন্তু যেটা বলার সেটা কেউ বলছে না। কেউ সৌদি আরবকে এই ঘটনার জন্য দায়ী করছে না। উল্টো অপপ্রচারের অভিযোগ তুলেছেন আমাদের কর্তৃপক্ষ। শরীরে ইস্তিরির পোড়া দাগ, হাত-পা ভাঙাসহ শরীরে যতই প্রমাণ থাকুক, দূতাবাসগুলো এসব সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরছে না। বরঞ্চ চুক্তির আগে ফিরে আসার কারণে তাদের খেসারত দিতে হচ্ছে।
অন্যান্য দেশ যেখানে কোনো নারীকর্মী সৌদি আরবে পাঠাতে চায় না, সেখানে আমরা উন্নয়নশীল স্ট্যাটাস নিয়ে আমাদের বোনদের পাঠাবো কেন? আর জেনেই যখন পাঠাচ্ছি তখন তারা ফিরে আসার পর পরিবারে গ্রহণ করে নিতে সমস্যা কোথায়?
২০১৮ সালের আরেকটা পোস্ট:
সৌদি অন্তঃপুরের চিত্র : একই পরিবারের কর্তা ও তার ছয় ছেলে মিলে বার বার ধর্ষণ করেছে তাঁকে। একটু প্রতিবাদ করলেই জুটেছে কিল-ঘুষি-লাথি। দেহ তিন টুকরো করে ফ্রিজে রেখে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়েছে।
২৫ হাজার টাকা মাইনের জন্য আড়াই লাখ টাকা ব্যয় করে ফুলটাইম কাজ করতে সৌদির মতো বিকৃত যৌন-আচারী পরিবারে কাজ করতে যাচ্ছে কেন আমাদের মেয়েরা? সরকারই বা পাঠাচ্ছে কেন এটাই আমার বোধগম্য না। পৃথিবী জানে, কর্মজীবী নারীরা সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে সৌদিতে। আর ওখানে কর্মজীবী নারী মানেই সিংহভাগ গৃহকর্মী। নারীর নিরাপত্তাহীনতায় সৌদির পরেই আছে কুয়েত-কাতার। যে কারণে ফিলিপাইন-শ্রীলঙ্কা সৌদিতে আর নারীকর্মী পাঠাচ্ছে না। আরবের মতো পবিত্র ভূমিতে, যেখানে গোটা মুসলিম বিশ্ব পবিত্র হজপালন করতে যায়, গোটা আরবকে তীর্থভূমি মানে, সেখানে কেন নারীরা যৌননির্যাতনের শিকার হবে, সে প্রশ্ন আমার না। সেটা একান্ত তাদের ব্যক্তিগত এবং ঘরোয়া বিষয়। আমার প্রশ্ন হল, আমরা যে এই বিরাট সংখ্যক নারীকর্মী–অর্থাৎ আমাদেরই মা-বোনকে ওখানে পাঠাচ্ছি, তার জন্যে আমরা কতটা প্রস্তুত? পাঠিয়ে দিলেই তো হল না, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে রাষ্ট্রের। রেমিটেন্স আসছে এটাই বড় কথা না। সৌদি সরকার যখন কন্ডিশন দিয়ে ৩৪ বছরের নিচে নারী গৃহকর্মী নিচ্ছে, তখনই তো বোঝা উচিত ছিল ডাল মে কুছ কালা হে! খবরে এসেছে, সৌদি আরবের নারীরা তাদের সংসারে গৃহপরিচারিকা হিসেবে দেখতে সুন্দর নারীদের নিতে চান না। সৌদি আরবের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বলছে, গৃহবধূরা এখন আগে থেকেই সম্ভাব্য গৃহপরিচারিকার ছবি দেখতে চাইছেন, বিশেষ করে যারা মরক্কো ও চিলি থেকে আসছে। তাহলে?
২০১০ কি ২০০৯ সালে এক ইন্দোনেশীয় নারী শ্রমিক তাঁর সৌদি মালকিনের আর পরিবারের লোকজনের অত্যাচার-নির্যাতনের খাসলত বদলাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ছুরি চালিয়ে প্রতিকারের শেষ চেষ্টা করেন। মালকিনের দম বেরিয়ে যায়। সে দেশের আইনে খুনি হয়ে যান এই দেয়ালে পিঠ আটকে যাওয়া বোনটি। তাঁকে আর পাঁচটা খুনির মতো কতল করা হয়। দূতাবাস জানতে পারে অনেক পরে। সারা ইন্দোনেশিয়া উত্তাল হয়ে ওঠে। নারী গৃহকর্মীদের ওপর অত্যাচার-অবিচারের কাহিনি একের পর এক বেরিয়ে আসতে থাকে। সৌদিতে গৃহকর্মী সরবরাহকারী অপর দুই প্রধান দেশ শ্রীলঙ্কা আর ফিলিপাইনের মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইন্দোনেশিয়ার মানবাধিকারকর্মীদের সঙ্গে এককাট্
Sharing is caring!