লালমনিরহাটে ভোরের অভিযানে অনলাইন ক্যাসিনো চক্রের ৫ সদস্য গ্রেপ্তার, উদ্ধার ৮২ সিম
লোকমান ফারুকঃ ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি নামেনি। কুয়াশা ঝুলছিল মাটির কাছাকাছি। সেই সময়েই উত্তরাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা জেলা লালমনিরহাট-এর কালীগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুরে ঢোকে জেলা গোয়েন্দা শাখার একটি দল। লক্ষ্য—একটি বাড়ি, অভিযোগ মোবাইলের পর্দায় গড়ে ওঠা এক অদৃশ্য ক্যাসিনো।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) ভোর রাতে পরিচালিত অভিযানে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা হয়েছে ৬টি মোবাইল ফোন ও ৮২টি সিম কার্ড।
ডিবি পুলিশের দাবি, চন্দ্রপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর বত্রিশ হাজারী গ্রামে স্থানীয় বাসিন্দা বাদশা মিয়ার বাড়িতে বসেই চলছিল এই নেটওয়ার্ক। মোবাইলভিত্তিক বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় পরিচয়পত্রে নিবন্ধিত সিম দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল অনলাইন জুয়ার একটি চক্র। গ্রেপ্তারদের মধ্যে তিনজন একই গ্রামের বাসিন্দা মো. নাজমুল ইসলাম (২১), মো. রফিকুল ইসলাম আকাশ (২০) ও মো. মেহেদী হাসান (১৯)। অপর দুজন হলেন মো. আফছার আলী (২৩), যার বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচর এলাকায়, এবং মো. আশরাফুল ইসলাম আরিফ (২৪), চন্দ্রপুরের বাসিন্দা।
পুলিশ বলছে, উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোনগুলোতে একাধিক অনলাইন বেটিং অ্যাপ ইনস্টল করা ছিল। জব্দ করা ৮২টি সিম কার্ডের সঙ্গে নগদ ও বিকাশের একাধিক হিসাব খোলা ছিল। এগুলো ব্যবহার করে লেনদেন ও জুয়ার অর্থ ঘুরত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা তদন্তকারীদের। জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) অফিসার ইনচার্জ মো. সাদ আহমেদ বলেন, “গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অনলাইন ক্যাসিনো চক্রের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ আইনে কালীগঞ্জ থানায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
গ্রামের একটি সাধারণ বাড়ি টিনের চাল, সামনে শীতের শুকনো উঠান সেখানেই যদি তৈরি হয় ডিজিটাল জুয়ার আসর, তবে নিয়ন্ত্রণের দেয়াল কোথায়? ৮২টি সিম কার্ড—কোন প্রক্রিয়ায়, কার পরিচয়ে, কত সহজে নিবন্ধন নেয়া হয়েছে? নিবন্ধন প্রক্রিয়ার ফাঁক কি এতটাই প্রশস্ত যে তা দিয়ে একটি নেটওয়ার্ক ঢুকে যেতে পারে অদৃশ্যভাবে?
অনলাইন জুয়া এখন আর আলোর ঝলকানিতে ভরা শহুরে ক্যাসিনোর বিষয় নয়; এটি পকেটের ভেতরের একটি অ্যাপ, নীরব কিন্তু সক্রিয়। লেনদেন হয় কয়েক সেকেন্ডে। হার-জিতের হিসাব থাকে স্ক্রিনে, কিন্তু তার সামাজিক মূল্য চুকায় পরিবার। আইন বলছে এটি অপরাধ। প্রযুক্তি বলছে এটি সহজ। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সমাজ যেখানে বেকারত্ব, দ্রুত অর্থের প্রলোভন আর ডিজিটাল অবকাঠামোর বিস্তার এক অদ্ভুত সমীকরণ তৈরি করেছে।
ডিবির অভিযান একটি ঘর ভেঙেছে। কিন্তু নেটওয়ার্ক কি ভেঙেছে? এই প্রশ্নই এখন ভোরের কুয়াশার মতো ঝুলে আছে উত্তর বত্রিশ হাজারীর আকাশে।
Sharing is caring!