২১শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২রা শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

আলুর কম মূল্যে মাথায় হাত উত্তরের কৃষকের

admin
প্রকাশিত ডিসেম্বর ৮, ২০২৫, ০৯:৩৭ অপরাহ্ণ
আলুর কম মূল্যে মাথায় হাত উত্তরের কৃষকের

Manual2 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি

সকালের কুয়াশা ভেদ করে রাজশাহীর পুঠিয়ার যে কাঁচাবাজারে ঢোকা যায়, সেখানে আজকাল আর আগের সেই আলু-মাটির গন্ধ নেই। বরং একটা চাপা শ্বাসরোধ—যেন আলুর বস্তার ভেতর বহুদিন জমে থাকা বাষ্পের মতো। দাম এতটাই কম যে চাষিরা নিজেরাই বস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন, ‘এটাই কি সেই আলু, যার জন্য আমরা হিমাগারের বেশি ভাড়া দিয়েছিলাম?’
চিত্রটা যেন নাটকের প্রথম দৃশ্য; আলো নিম্নমুখী, সবার মুখে অস্বস্তির রেখা। কিন্তু এই নাটকটি বাস্তব এবং নিষ্ঠুর।

একটা বছর, যা চাষিদের কাছে অভিশাপ

গত মৌসুমে প্রচুর আলু ফলেছিল—এক অর্থে এত বেশি যে, ফসল মাঠেই কেজি ১২–১৫ টাকায় বিক্রি করে অনেকেই ভেবেছিলেন; ‘বর্ষায় দাম বাড়বে।’ সেই আশায় রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের হাজারো চাষি হিমাগারে ঠাঁই নিয়েছিলেন। উচ্চ ভাড়া দিয়ে সংরক্ষণ করেছিলেন লক্ষ টন আলু—সম্ভাবনার আর্থিক টিকিট ভেবে। কিন্তু বর্ষা শেষ হয়েছে, শীত এসেছে, আর দাম? হিমাগার ফটকে ১৫ টাকা। বাজারে খুচরা ২০–২৫ টাকা।
চাষি ইয়াকুব আলীর কথায়, ‘হিমাগারের ভাড়াই উঠবে না ভাই… আলু বের করবো? নাকি গলায় দড়ি দেব?’

উত্তরাঞ্চলের অজস্র বাজারেই চাষিদের এই বাক্য বারংবার শোনা যায়—একটা স্তব্ধ, জমাট বেদনার মতো।

হিমাগারের ভেতরে অন্ধকার আর পচন

Manual7 Ad Code

রাজশাহীর একাধিক কোল্ড স্টোরেজ ঘুরে পাওয়া দৃশ্য—
কোথাও কোথাও আলুতে পচন ধরেছে। চাষিরা বাধ্য হয়ে পানির দামে বিক্রি করছেন, কেউ আবার ট্রাক ভর্তি আলু ফেরত নিয়ে যাচ্ছেন গ্রামের উঠোনে, যেখানে শিশুরা কৌতূহলী চোখে দেখে—”এই আলু দিয়ে কি টাকা আসবে?”
আর হিমাগার মালিকদের কাছে সময়ই সবচেয়ে কঠোর ভাষা। চুক্তি শেষ হলে আলু বের করতেই হবে।
অনেক জায়গায় নোটিশও চলে গেছে। চাষিরা টের পাচ্ছেন—এখন আর তাদের হাতে কিছু নেই।

অতিরিক্ত উৎপাদন, সীমিত বাজার

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে—৩ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টরে আলুর আবাদ, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি উৎপাদন। এত বেশি যে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ছাপিয়ে গেছে। আর হিমাগারগুলো? ২২১টি হিমাগারের ধারণক্ষমতা ২৭ লাখ ৭৫ হাজার টন। সংরক্ষণ করা হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টন—গাদাগাদি করে। সেখানে এখনও ২৫ লাখ টন আলু পড়ে আছে। এর মধ্যে বীজ আলু ৫ লাখ টন। বাকিটা বাজারের জন্য।
কিন্তু মাত্র আড়াই মাস পরেই নতুন আলু বাজারে চলে আসবে। পুরনো আলু তখন কাগজের মতই মূল্যহীন হয়ে যাবে। এ যেন সময়ের এক নিষ্ঠুর ঘড়ি, দ্রুতগতিতে কাউকে ধাওয়া করছে।

সরকারি কর্মকর্তার স্বীকারোক্তি—’দাম বাড়ানোর ক্ষমতা আমাদের নেই’। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সিনিয়র বিপণন কর্মকর্তা মো. সানোয়ার হোসেন একরকম অসহায়ের স্বরে বললেন—’ফলন খুবই ভালো হয়েছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। রপ্তানি হলে চাষিরা বাঁচত। কিন্তু মানসম্মত আলু নেই। চাষিরাও সে চেষ্টায় নেই।’ তার আরও মন্তব্য—’সরকার চাইলে দাম বাড়াতে পারে না।

অর্থাৎ—চাষির দুর্দশাকে বাজারের ‘স্বাভাবিক ঘটনা’ বলে ব্যাখ্যা করাই যেন নীতিনির্ধারকদের সহজ পথ।

হিমাগার মালিকদের দোটানা

Manual5 Ad Code

‘চাষিরা আলু বের করতে চায় না’ রাজশাহী হিমাগার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমানের যুক্তি—”৩৭টি কোল্ড স্টোরেজে এখনো ৭০ শতাংশ আলু পড়ে আছে। আগামী মৌসুম শুরুর আগেই আমাদের সব হিমাগার খালি করতে হবে।’ চাষিদের আলু নিতে হবে।’
তিনি আরও বলেছেন—”অস্বাভাবিক কম দামের কারণে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত। সরকার ন্যূনতম দাম নির্ধারণ করলে তারা বাঁচত।

এ বক্তব্যেই যেন লুকিয়ে আছে বৃহত্তর সত্য—বাজারের নিয়ন্ত্রণ নেই চাষির হাতে, আর নীতির নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে, তারা নীরব দর্শক।

অর্থনীতি, নেটওয়ার্ক ও দালালচক্র

অতিরিক্ত উৎপাদন—একটি অংশ। কিন্তু কেন চাষিরা বারবার একই ফাঁদে? গ্রামগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানান—
হিমাগারের ভাড়া বাড়ানো, পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দালালি—সব মিলিয়ে একটা অদৃশ্য নেটওয়ার্ক আছে, যারা লাভবান হয় বাজার ভেঙে পড়লে।
কৃষকের ক্ষতি মানেই, হিমাগার মালিকের লাভ,দালালের লাভ, কিছু বড় পাইকারের লাভ। এই নেটওয়ার্ক এত নিঃশব্দে কাজ করে যে, কাগজে-কলমে তার অস্তিত্ব নেই। কিন্তু চাষিদের পকেট খালি হয়ে যাওয়া, তার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ।

চাষি—যিনি সবচেয়ে বেশি উৎপাদন করেন, কিন্তু সবচেয়ে কম পান। রাজশাহীর কৃষক মনোহর আলী বললেন—’আমরা ধান করলেও লোকসান, আলু করলেও লোকসান। আমরা তাহলে কি চাষ করবো?
এই প্রশ্নে কেবল ক্ষোভ নয়—এখানে বয়ে চলে এক প্রজন্মের হতাশা।

নীতির শূন্যতা আর আগামীর ভয়

সরকার যদি ন্যূনতম দাম নির্ধারণ করত, রপ্তানির জন্য উদ্যোগ নিত, গুণগতমানের আলু উৎপাদন–সংরক্ষণে সহায়তা দিত—হাজার হাজার চাষি আজ দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতো না। যে আলু একসময় দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আজ তা চাষির ঘরে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আর ভয়টা এখানেই—এই ধাক্কায় যদি চাষিরা আলু আবাদ কমিয়ে দেন। তাহলে পরের বছর আবার ঘুরে দাঁড়াবে ঘাটতি ও উচ্চদামের দানবচক্র। কৃষক হারবে, ভোক্তা হারাবে, লাভ করবে কেবল সেই অদৃশ্য মধ্যস্বত্বভোগী নেটওয়ার্ক—যারা বাজারকে নিজের মতো করে সাজায়।

Manual3 Ad Code

রাজশাহীর বাজারে ফিরে যাই

দিন শেষে সেই একই বাজারে দাঁড়ালে চোখে পড়ে
গোটা দেশের কৃষিনীতির এক প্রতীকী ছবি—বস্তায় ভরা আলু, বস্তার পাশে নুয়ে পড়া কৃষক, আর পাশে দাঁড়ানো ক্রেতা, যিনি ভাবছেন—’২০ টাকা কেজি হলে তো খারাপ না।’

এই দুই দৃষ্টির মাঝখানে রয়েছে এক গভীর অন্ধকার—
যেখানে হারিয়ে যাচ্ছে চাষির পরিশ্রম, রাষ্ট্রের পরিকল্পনা,
আর বাজারের ভারসাম্য।

একজন বিশ্লেষকের ভাষায়—টাকার পথ অনুসরণ করলেই দেখা যায়, ক্ষতির বোঝা বহন করছে একমাত্র কৃষক; আর লাভের হিসাব লিখছে এক অদৃশ্য চক্র।

এই গল্পের শুরু ও শেষ একই—চাষির বেদনা। শুধু দৃশ্যপট বদলায়, সমস্যা একই রয়ে যায় বছরের পর বছর।
এই প্রতিবেদন তারই নীরব সাক্ষ্য।

Manual4 Ad Code

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code