১৩ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

উত্তরাঞ্চলের হোটেল–রেস্তোরাঁয় খাতায় কলমে ৮ ঘন্টা, বাস্তবে ১২ ঘন্টা আর নিন্মতম মজুরি

admin
প্রকাশিত জানুয়ারি ৫, ২০২৬, ০৬:৪৮ অপরাহ্ণ
উত্তরাঞ্চলের হোটেল–রেস্তোরাঁয় খাতায় কলমে ৮ ঘন্টা, বাস্তবে ১২ ঘন্টা আর নিন্মতম মজুরি

Manual5 Ad Code

লোকমান ফারুক, বগুড়া থেকে

বগুড়ার কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শকের কার্যালয়ে তখন নথির স্তূপ, চুপচাপ ফ্যানের ঘূর্ণন। হঠাৎই সেখানে হাজির হন উত্তরাঞ্চলের হোটেল–রেস্তোরাঁ শ্রমিক প্রতিনিধিবৃন্দ। হাতে একটি স্মারকলিপি—কিন্তু সেটি কেবল কাগজ নয়, সেটি ছিল দীর্ঘদিনের চাপা পড়ে থাকা ঘাম, অবদমিত ক্ষোভ আর বঞ্চনার দলিল।
একই সময়ে রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের দপ্তরগুলোতেও ই-মেইলের ইনবক্সে ভেসে আসে একই স্মারকলিপি—”নিম্নতম মজুরি কাগজে আছে, বাস্তবে নেই।” কাগজে আট ঘণ্টা, বাস্তবে বারো।
সরকারি নথি বলছে—হোটেল–রেস্তোরাঁ খাতে দৈনিক শ্রমঘণ্টা ৮। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি হোটেল–রেস্তোরাঁয় শ্রমিকদের দৈনিক কাজ ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা। ওভারটাইম? সেটি এখানে একটি নিষিদ্ধ শব্দ।
একজন রেস্তোরাঁ কর্মী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “খাতায় আমার ডিউটি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা। বাস্তবে আমি ঢুকি সকাল ৬ টায়, বের হই রাত ৯টায়। খাতায় আমি মানুষ, কাজে আমি যন্ত্র।” ভুয়া খাতা, আসল শোষণ।

Manual3 Ad Code

পরিদর্শন এলে সব ঠিক।

Manual3 Ad Code

হাজিরা খাতা ঝকঝকে। মজুরি রেজিস্টারে অঙ্ক মিলে যায়। কিন্তু ভেতরের গল্প ভিন্ন। একাধিক শ্রমিক নেতা ও সাবেক পরিদর্শন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, হোটেল মালিকদের একটি অদৃশ্য নেটওয়ার্ক কাজ করছে যেখানে আগেই বানানো থাকে ‘পরিদর্শন খাতা’ শ্রমিকদের বলা হয় কী বলতে হবে। আর অনেক ক্ষেত্রেই পরিদর্শন ব্যবস্থা চোখ বুজে দেখে—কারণ ‘উপরে কথা আছে!’
এই নেটওয়ার্কে লাভবান হচ্ছে কারা? মালিকপক্ষ, যারা কম মজুরিতে বেশি কাজ আদায় করছে। মধ্যস্বত্বভোগী দালাল শ্রেণি, যারা নথি “ম্যানেজ” করে। আর ক্ষতিগ্রস্ত?
হাজারো শ্রমিক—যাদের জীবনের হিসাব কোনো খাতায় ওঠে না।

আইন আছে, প্রয়োগ নেই

Manual2 Ad Code

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা: ৫, ১০০, ১০২, ১০৩, ১০৪, ১০৮, ১১৫–১১৮—সবই এখানে নিয়মিত লঙ্ঘিত। নিয়োগপত্র নেই। পরিচয়পত্র নেই। ছুটি নেই। পীড়া ছুটি? উৎসব ছুটি? এগুলো এখানে গল্পের উপাদান মাত্র। একজন শ্রম বিশ্লেষক বললেন,’আইন যখন থাকে, কিন্তু রাষ্ট্র প্রয়োগ করে না—তখন আইন নিজেই শোষণের অংশ হয়ে যায়।’

নিম্নতম মজুরি: ঘোষণায় আছে, বেতনে নেই

৫ মে ২০২৫—সরকার হোটেল–রেস্তোরাঁ শিল্পে নতুন নিম্নতম মজুরি ঘোষণা করে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সি ও ডি শ্রেণির রেস্তোরাঁগুলোতে গ্রেড-২, ৩ ও ৪-এর শ্রমিকদের বড় অংশ এখনও ঘোষিত মজুরির নিচে কাজ করছে। এমনকি শিক্ষানবিশ শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত হার মানা হচ্ছে না। এক শ্রমিকের কণ্ঠে ক্ষোভ, ‘আমরা শিক্ষানবিশ, কিন্তু শোষণের ডিগ্রি আমাদেরই বেশি।’

কে কাকে ঢাকছে?

প্রশ্ন উঠছে—পরিদর্শন হয়, কিন্তু শাস্তি হয় না কেন?
বারবার অভিযোগ আসে, কিন্তু ব্যবস্থা নেই কেন?
একটি গোপন সূত্র জানায়, স্থানীয় প্রভাবশালী মালিক, কিছু কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার মধ্যে নীরব সমঝোতা রয়েছে। এই চক্র ভাঙলে খুলে যাবে অনেক মুখোশ।১৪ জানুয়ারি: শেষ সতর্ক ঘণ্টা।

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে

হোটেল সেক্টরে সরকার ঘোষিত নিম্নতম মজুরি ও শ্রম আইন বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ এবং উত্তরাঞ্চল হোটেল রেস্তোরাঁ শ্রমিক পরিষদ ঘোষণা দিয়েছে—১৪ জানুয়ারি দেশব্যাপী কর্মবিরতি। আহ্বায়ক আব্দুল মমিন মন্ডলের কণ্ঠে দৃঢ়তা, “আমরা ভাঙচুর চাই না। আমরা আইন চাই।
কিন্তু আইন যদি শুধু বইয়ে থাকে—তাহলে শ্রমিক রাস্তায় নামতেই বাধ্য।”

Manual6 Ad Code

শুরু যেখানে, শেষও সেখানে

দুপুর ১২টায় জমা দেওয়া সেই স্মারকলিপি এখন সরকারি টেবিলে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—এই কাগজ কি বদলাবে শ্রমিকের জীবন, নাকি আরেকটি নথি হয়ে ধুলো জমাবে? উত্তর দেবে সময়। আর ১৪ জানুয়ারি।
কারণ ইতিহাস বলে—যখন শ্রমিক চুপ থাকে, তখন শোষণ উৎসব করে। আর যখন শ্রমিক জাগে, তখন নথির ভাষাও বদলাতে বাধ্য হয়।

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code