দিনাজপুরে গণপ্রকৌশল দিবস: রঙের ভিড়ে প্রযুক্তির স্বপ্ন, র্যালির ঢেউয়ে উঠে আসা জনতার প্রত্যয়।
লোকমান ফারুক : বিশেষ প্রতিনিধি।
সকালের নরম রোদ তখনো পুরোপুরি শহরের গা ছুঁয়ে বসেনি। তবুও দিনাজপুর ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে ভিড় জমেছে অদ্ভুত এক প্রত্যাশায়—কেউ যেন নতুন দিনের ইঞ্জিন চালু হওয়ার শব্দ শুনছে দূর থেকে। গণপ্রকৌশল দিবস ও ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)—এর ৫৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে আজকের অনুষ্ঠান সেই প্রত্যাশারই প্রকাশ।
দশটা বেজে পনেরো—প্রাঙ্গণে তখন নানা রঙের ব্যানার, শ্লোগান আর তরুণ প্রকৌশলীদের চোখে ভবিষ্যতের ঝিলিক। অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক ও দিনাজপুর পৌরসভার প্রশাসক মোঃ রিয়াজ উদ্দিন। তার আগমনে যেন ভিড়ের গুঞ্জন মুহূর্তেই ঠাণ্ডা হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল এক ধরনের গুরুত্ববোধ—যেন বাতাস জানিয়ে দিল, আজ উন্নয়নের কথাই বলা হবে।
বিশেষ অতিথির কাতারে দাঁড়িয়ে আছেন দিনাজপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল ওয়াদুদ মণ্ডল এবং আইডিইবির যুগ্ম আহ্বায়ক (রংপুর অঞ্চল) মোঃ আব্দুছ ছাত্তার শাহ। তাদের বক্তৃতায় বারবার ফিরে আসছিল এক কথাই—দক্ষতা হলো দেশের ইঞ্জিন, আর ইঞ্জিন ঠিক রাখার দায়িত্ব ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদেরই।
সভাপতির আসনে প্রকৌশলী মোঃ মিনারুল ইসলাম খান। মুখে শান্ত হাসি, বক্তৃতায় দৃঢ়তার রেখা। নীরবে শোনা যায় এমন এক বিশ্বাস—”প্রযুক্তির বহুমাত্রিক ব্যবহারই জনগণের সামগ্রিক মুক্তির পথ।” এই বাক্যটি যেন সেদিনের সূর্যের মতো মঞ্চের প্রতিটি মুখে আলো ফেলছিল।
সবশেষে মাইক্রোফোন ধরলেন সঞ্চালক প্রকৌশলী মোঃ শাহানুর রহমান। তার কণ্ঠে ছিল অভ্যস্ত মাঠপর্যায়ের তাগিদ—দক্ষ জনশক্তি ছাড়া দেশের উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমে। মধুর কণ্ঠে বলা হলেও কথার ভিতরে ছিল দৃঢ় বাস্তবতা।
মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শতাধিক ছাত্র-শিক্ষক, প্রবীণ ও তরুণ প্রকৌশলী—সবার চোখে এক ধরনের স্বপ্নের ধাঁধা। তারা যেন একমুহূর্তের জন্যও ভুলে যায়নি যে প্রযুক্তি শুধু চাকরি বা ডিগ্রি নয়—এটি নীরবে দেশ বদলে দেওয়ার শক্তি।
এরপর ইনস্টিটিউটের প্রধান ফটক থেকে বেরিয়ে রংবেরঙের প্ল্যাকার্ড হাতে অংশগ্রহণকারীরা হাঁটছিলেন শহরের প্রধান সড়ক ধরে। রাস্তার দুইপাশের দোকানিরা জমাট ভিড় দেখছিলেন বিস্ময়ে—যেন দিনাজপুরের আজকের এই যাত্রা শুধু উৎসব নয়, ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন।
প্রবাদ আছে—যে হাতের কাজে আলো আছে, সে হাত কখনো অন্ধকারে থাকে না। র্যালির মুখগুলোতে সেই আলোই দেখা যাচ্ছিল। কেউ কেউ বলছিলেন, ‘ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের মূল্যায়ন মানে দেশের শিল্প-উন্নয়নের মেরুদণ্ড।’ আর কেউ আবার চুপচাপ হাঁটছিলেন—বাস্তবতা জানেন, পথ লম্বা, কিন্তু থামার সুযোগ নেই।
অনুষ্ঠান শেষে মনে হচ্ছিল—আজকের দিনটি যেন দিনাজপুরের প্রকৌশলীদের জন্য একটি নতুন প্রণোদনা, একটি নৈতিক প্রশ্নও—দক্ষ জনশক্তি তৈরির এই প্রতিশ্রুতি কি রাষ্ট্র পর্যায়ে যথেষ্ট গুরুত্ব পাবে? নাকি উৎসবের রঙ মিলিয়ে গেলে আবারও ফেরত যাবে পুরোনো অপেক্ষার অন্ধকারে?
কিন্তু র্যালির শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণদের মুখ দেখে মনে হলো—অন্তত তারা হাল ছাড়েনি। ভবিষ্যতের রূপরেখা তারা নিজেরাই আঁকবে, নিজের শ্রমে।
মঞ্চ যেমন শুরু করেছিল ‘মুক্তির প্রতিশ্রুতি’ দিয়ে, শেষও হলো সেই একই উচ্চারণে—’দক্ষ জনশক্তি, আর সেই জনশক্তিই দেশের উন্নয়নের ভিত্তি।’
Sharing is caring!