বিশেষ প্রতিনিধি
২১ নভেম্বর ২০২৫ নভেম্বরের হালকা কুয়াশা ভেদ করে সকালবেলা মতিঝিলের বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়—দেশের অর্থনীতিকে টেনে রাখার অদৃশ্য কোনো নদী গভীর নীরবতায় বয়ে যাচ্ছে। প্রবেশ পথের ধাতব দরজা খুলে–বন্ধ হওয়ার শব্দের সঙ্গে মিলেমিশে আছে সেই প্রবাহের গুঞ্জন—রেমিট্যান্স। প্রবাসীদের ঘামে রঙিন ডলার, যা দেশের বুকের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই নভেম্বরের প্রথম ১৯ দিনে সেই নদীর স্রোত বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে—২০০ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ২৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
গত বছরের তুলনায় ৩১ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নিচু গলায় বললেন, “ভাই, এভাবে চলতে থাকলে নভেম্বরে ৩ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করা কোনো কথাই না। মনে হয় নদীর পানি ফুলে-ফেঁপে উঠছে।” রেমিট্যান্স কি শুধু সংখ্যা? নাকি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে জীবনের গল্প, সংগ্রাম আর অর্থনীতির অদৃশ্য রাজনৈতিক শক্তি?
প্রবাসীদের পাঠানো প্রতিদিন ১০ কোটি ডলারের লড়াই প্রতিদিন গড়ে ১০ কোটি ৫৬ লাখ ডলার—শুনতে সহজ। কিন্তু সেই টাকার পেছনে আছে আরবের রোদের নিচে দাঁড়ানো এক শ্রমিকের জ্বলন্ত দুপুর, মালয়েশিয়ার পাম বাগানে কুয়াশায় ভেজা ভোর, ইতালির কোনো রেস্তোরাঁয় ১২ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা ওয়েটারের কোমরের ব্যথা। কাতারের দোহায় থাকা শরীয়তপুরের এক প্রবাসী নির্মাণ শ্রমিক ওয়েসলি মেসেঞ্জারে আমাকে বললেন, ‘আমরা টাকা পাঠাই দ্রুত। কারণ দেশে পরিবার হাতে টাকা পেলে মনে হয়—আমাদের পরিশ্রম বৃথা যায়নি।
‘ তার কণ্ঠে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু গর্বও ছিল। এই গর্বই রেমিট্যান্সের নদীকে প্রতিদিনের মতো আজও বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির ভেতরের নথিহীন নীরব সত্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নথি ঘাঁটলে দেখা যায়—চলতি অর্থবছরের (২০২৫–২৬) শুরু থেকে ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে আসা রেমিট্যান্স ১,২১৬ কোটি ডলার। গত বছর একই সময়—১,০৪৭ কোটি ডলার। পরিসংখ্যানগতভাবে প্রবৃদ্ধি ১৬.১%। কিন্তু নথির ভেতরে আরও একটি অদৃশ্য রেখা আছে—হাওয়ায় ভাসমান ডলারের পথ আটকাতে ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক তৎপরতা।
একজন এক্সচেঞ্জ হাউসের মালিক, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, আমাকে বললেন—’হুন্ডিতে আগের মতো সুবিধা নেই। ব্যাংক এখন দ্রুত টাকা পৌঁছে দিচ্ছে। তার ওপর ইনসেনটিভ তো আছেই। ফলে গ্রাহকরাই ব্যাংকের পথে ঘুরছে।’ তার কথার সুরে ছিল স্বস্তি—বা হয়তো সতর্কতা। কারণ, এই বাজারে নীরবতা মানেই পরিবর্তনের গন্ধ। রেমিট্যান্সের মাসভিত্তিক ওঠানামা—এক নদীর জোয়ার ভাটা পরিসংখ্যানের পাতায় দেখা যায়— জুলাই: ২৪৭.৭৮ কোটি ডলার। আগস্ট: ২৪২.১৯ কোটি। সেপ্টেম্বর: ২৬৮.৫৮ কোটি। অক্টোবর: ২৫৬.৩৫ কোটি। একটি অদ্ভুত গতিময়তা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক উপপরিচালক আমাকে বললেন, “এটি নদীর জোয়ার ভাটার মতো; কিন্তু জোয়ারটাই এখন জোয়ারের ওপর।” তার মুখে সূক্ষ্ম হাসি—যেন ভবিষ্যতের আশায় রেখা পড়ছে। পেছনের বছরগুলোর রেকর্ড—যে পাহাড় চড়ার চেষ্টা চলছে ২০২৪–২৫ অর্থবছরের মার্চে রেমিট্যান্স দাঁড়ায় ৩২৯ কোটি ডলার—এক বছরের সর্বোচ্চ রেকর্ড। পুরো অর্থবছরে দেশ পেয়েছিল ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার, আগের বছরের তুলনায় ২৬.৮% বেশি। আরও পেছনে গেলে—২০২৩–২৪ অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্স এসেছিল ২৩.৯১ বিলিয়ন ডলার। এই সংখ্যাগুলোর মধ্যে মানুষ আছে, গল্প আছে, শ্রম আছে। কিন্তু তারা কাগজের পাতায় শুধু সংখ্যা হয়েই থাকে।
ঘটনার ভেতরের ঘটনাঃ প্রণোদনা, চাপ ও অদৃশ্য লবির ভূমিকা অর্থনীতিবিদরা বলছেন—রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পেছনে চারটি কারণ মূল:
১. ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রচারণা বাড়া।
২. সরকারের প্রণোদনা।
৩. হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ।
৪. এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর আগ্রাসী প্রতিযোগিতা কিন্তু এর বাইরে আছে এমন কিছু বিষয়, যা কেউ সরাসরি বলতে চায় না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা আমাকে শুধু এটাই বললেন—’রেমিট্যান্স যে বাড়ছে, এটা যেমন সুশাসনের ফল; তেমনি বাজারের কিছু খেলোয়াড়ের কৌশলও। সব কথা প্রকাশ করলে পরিস্থিতি নড়বড়ে হয়ে যাবে।
‘ তার কথার মাঝে ছিল সেই নীরব ইঙ্গিত—সত্য কিছুটা প্রকাশ্যে, কিছুটা ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকে। প্রশ্ন—এই প্রবাহ টিকে থাকবে তো? যখন দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সই স্থিতিশীলতার সবচেয়ে শক্ত স্তম্ভ, তখন প্রশ্ন ওঠে—এই স্রোত কি দীর্ঘস্থায়ী? নাকি বাজারে সাময়িক কোনো চাপ, প্রণোদনার ঝলক, আর প্রবাসীদের বার্ষিক পরিকল্পনা- এই উত্থান তৈরি করেছে?
এক অর্থনীতিবিদ বললেন, ‘এই বাড়তি প্রবাহ ধরে রাখতে হলে প্রবাসীদের আস্থা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ইনসেনটিভ দিয়ে নদী চিরকাল বইবে না।’ ফিরে আসা—নভেম্বরের ভোর আর সেই অদৃশ্য নদী মতিঝিলের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে দেখি—মানুষ অফিসে যাচ্ছে, হাতে ফাইল, মাথায় চিন্তার বোঝা। তাদের জীবনকে স্থির করে রেখেছে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ। রেমিট্যান্স যেন দেশের মাটির নিচে বয়ে যাওয়া এক ভূগর্ভস্থ নদী—চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সে-ই উর্বর করে রাখে জমি, বাজার, পরিবার, ভবিষ্যৎ।
শুরুতে যেমন বলেছিলাম—সেই নদী আজও বয়ে যাচ্ছে, ২৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নিয়ে। শেষেও তাই বলতে হয়—দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে এক অদৃশ্য স্রোতের ওপর; যে স্রোত তৈরি হয় হাজার মাইল দূরে ঘাম ঝরানো মানুষদের কঠিন পরিশ্রমে। তাদের শ্রমের প্রতিটি ফোঁটাই সংখ্যায় রূপ নেয়। সংখ্যার ভেতর লুকিয়ে থাকে গল্প—আর সেই গল্পটাই দেশের সবচেয়ে বড় সত্য।