২৩শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৮ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

ডেঙ্গু কেড়ে নিল আরও ৬ প্রাণ

admin
প্রকাশিত নভেম্বর ১৯, ২০২৫, ০৭:৩৩ অপরাহ্ণ
ডেঙ্গু কেড়ে নিল আরও ৬ প্রাণ

Manual2 Ad Code

ডেঙ্গু কেড়ে নিল আরও ৬ প্রাণ

লোকমান ফারুক, বিশেষ প্রতিনিধি

রাতের শেষ প্রহরে ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউ করিডোরে বাতাসটা অস্বাভাবিক ভারী। স্বজনের চোখের কোণে জমানো আতঙ্ক, ডাক্তারদের দ্রুত পা ফেলার শব্দ আর বাইরে ভেজা বাতাসে জমে থাকা মশার চাপা গুঞ্জন—সব মিলিয়ে মনে হয়, অদৃশ্য কোনো শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছে গোটা দেশ। সেই শত্রুর নাম—ডেঙ্গু।

গত ২৪ ঘণ্টায় এডিস মশাবাহিত এই রোগ দেশে কেড়ে নিয়েছে আরও ৬টি প্রাণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি জানাচ্ছে, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ৩৪৯ জনে—একটি ভয়াবহ সংখ্যা, যা সরকারি রিপোর্টের পাতায় থাকা শুকনো অঙ্ক নয়; প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি অসমাপ্ত জীবনের নাম।

সংখ্যার ফেরে মৃত্যু–জীবনের হিসাব

২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ৭৮৮ রোগী। আর বছরের শুরু থেকে হাসপাতালের বিছানায় শুতে হয়েছে ৮৭ হাজার ৭১২ জনকে। পরিসংখ্যান বলছে—যদিও ৮৪ হাজার ৫৭০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন, তবু এখনো ৩,১৪২ জন জীবন-মৃত্যুর লড়াই লড়ছেন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে।

Manual1 Ad Code

বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন—ডেঙ্গুর এই ওঠানামা কি কেবল মৌসুমের খেলা, নাকি নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার ‘সমষ্টিগত পরিণতি’?

একজন মহামারি বিশেষজ্ঞ বলেন,”এডিস মশা শহরের অগোছালো জীবনযাত্রার মতোই—যেখানে ফাঁক ফোকর, সেখানেই তার বাড়ি।” তার কথার ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে নীতিনির্ধারকদের দায় আর নাগরিকদের অচেতনার অপ্রকাশিত স্বীকারোক্তি।

অক্টোবর—মৃত্যুর কালো অধ্যায়

চলতি বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ মাস ছিল অক্টোবর। সেই মাসেই প্রাণ হারান ৮০ জন—এক মাসে সর্বোচ্চ।
নভেম্বরেও মৃত্যুর মিছিল থামেনি; এখন পর্যন্ত ৭১ জনের প্রাণহানি।

Manual8 Ad Code

বছরের প্রথম দিকটা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক ছিল। জানুয়ারিতে মৃত্যু ১০, ফেব্রুয়ারিতে মাত্র তিন, মার্চে কেউই মারা যায়নি। কিন্তু এপ্রিলের পরই পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে—মাল্টার ফুলের মতো নীরবে বাড়ে সংখ্যাগুলো। জুনে ১৯, জুলাইয়ে ৪১, আগস্টে ৩৯ জন মারা যায়। যেন বর্ষার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুও ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে জীবনের ফাঁকফোকরে।

Manual8 Ad Code

হাসপাতালের ভেতরের দৃশ্য—একটি দিনের ডায়েরি

রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালের করোনা-পরবর্তী জরাজীর্ণ ওয়ার্ড এখন ডেঙ্গুর ওয়ার্ড। সকাল ১০টার দিকে এক নার্স হতাশ গলায় বলছিলেন—
“বেড নেই, কিন্তু রোগী থামে না।’ গায়ের জ্বর আর রক্তপাতে মানুষ আসছে একের পর এক।’ একজন বৃদ্ধ বাবা মেঝেতে বসে থাকা সন্তানের কপালে হাত রেখে ফিসফিস করছিলেন—”আরেকটা রাত পার হলে হয়তো বাঁচবে”….। তার কণ্ঠের কম্পনই বলে দিচ্ছিল বাস্তবতা: ডেঙ্গু শুধু রোগ নয়; এটি মানুষের দুর্বলতার আয়না—যেখানে প্রতিফলিত হয় ব্যর্থ প্রস্তুতি, অনিয়ম আর উপেক্ষার দীর্ঘ ইতিহাস।

কোথায় সমস্যা—কার হাতে সমাধান?

ডেঙ্গুর এই বাড়ন্ত গ্রাফ বারবারই প্রশ্ন তোলে—মশা মারার অভিযান কি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ? ড্রেনে ময়লা, অরক্ষিত নির্মাণাধীন ভবন, ছাদে জমে থাকা পানি—এসব কি বাস্তবে নজরদারির বাইরে?

আরেকজন শহর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ বলেন—
‘ডেঙ্গু কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটা আমাদের তৈরিই। গাফিলতির সুতো ধরে টেনে আনলে এর শেষ প্রান্তে আমরা-ই।’
এ যেন সেই পুরোনো প্রবাদ—”যেমন বপন, তেমন ফসল।” নীতিনির্ধারকদের ত্রুটি, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দায়হীনতা আর নাগরিক উদাসীনতার সমষ্টিতে জন্ম নেয় এই ‘মশা-সন্ত্রাস’।

অনিবার্য সমাপ্তি—যা আবারও শিখিয়ে দিল ডেঙ্গু

Manual2 Ad Code

ডেঙ্গু যেন প্রতিবারই একটি অদৃশ্য শোকগাথা রেখে যায়। আজকের ৬টি মৃত্যু কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার সামনে নৈতিক প্রশ্ন—কত প্রাণ গেলে আমরা সত্যিকারের প্রস্তুত হব? কত অশ্রু ঝরলে আমরা বুঝব—ডেঙ্গু এখন মৌসুমি নয়, বারোমাসি হুমকি?

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের করিডোর আরও নিস্তব্ধ হয়ে আসে। চিকিৎসকের ঘড়ির কাঁটা টুপটুপ করে সময় গোনে। বাইরে সড়কবাতির নিচে ছটফট করে উড়ে বেড়ায় এডিস মশা—যেন মৃত্যুর বার্তা বহনকারী এক অদৃশ্য দূত।

আর আমরা অপেক্ষা করি—একটি ভালো আগামীকালের, যেখানে ডেঙ্গু আর কাউকে চুপিসারে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে না।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—আগামীকাল কি সত্যিই আজকের চেয়ে নিরাপদ হবে?

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code