১৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৭শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

প্রতি ১০ শিশুর ৪ জনের রক্তে ‘উদ্বেগজনক’ সীসা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের শরীরে জমছে নীরব বিষ।

admin
প্রকাশিত নভেম্বর ১৬, ২০২৫, ০৮:২৭ অপরাহ্ণ

Manual3 Ad Code

প্রতি ১০ শিশুর ৪ জনের রক্তে ‘উদ্বেগজনক’ সীসা
বাংলাদেশের ভবিষ্যতের শরীরে জমছে নীরব বিষ।

বিশেষ প্রতিনিধি।

রবিবার সকালের ঢাকা—ধুলা, ধোঁয়া আর ভেজা রোদ মিলেমিশে তৈরি করেছে এক ভারী আকাশ। রাজধানীর এক হোটেলের হলরুমে ঠিক তখনই দেশের শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেমে এল আরও ভারী এক অন্ধকার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং ইউনিসেফের যৌথ জরিপের ফলাফল প্রকাশের মুহূর্তে যেন পুরো হলরুমে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। বক্তাদের হাতের কাগজে লেখা তথ্যগুলো মনে হচ্ছিল একেকটি বুলেট—অদৃশ্য, নীরব, কিন্তু মারাত্মক।

জরিপ বলছে—বাংলাদেশের প্রতি ১০ শিশুর ৪ জনের রক্তে ‘উদ্বেগজনক’ মাত্রায় সীসা। এটা শুধু একটি সংখ্যা নয়। এটা শিশুদের মস্তিষ্কে, নার্ভে, রক্তে জমে থাকা সেই বিষের হিসাব, যা তাদের ভবিষ্যৎকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করছে—অচেনা এক নীরব ঘাতকের মতো।

ঢাকা—সীসার রাজধানী।

প্রথম স্লাইড ওঠতেই পুরো কক্ষ থমকে যায়—ঢাকার ৬৫ শতাংশেরও বেশি এলাকায় শিশুদের রক্তে সীসার মাত্রা নিরাপদ সীমার ওপরে। পরিসংখ্যানগুলো যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠা এক অদৃশ্য মানচিত্র—যেখানে ঢাকার প্রতিটি গলি, প্রতিটি ঘর, প্রতিটি শিশুর বুকের ভেতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে বিষের স্রোত। একজন অংশগ্রহণকারী ধীর গলায় বললেন, “সীসা দূষণকে আমরা যত কম গুরুত্ব দিই, সে তত নিঃশব্দে আমাদের ঘর দখল করে নেয়।”

Manual4 Ad Code

৬৩ হাজার পরিবার—একটি দেশের প্রতিচ্ছবি

বিবিএস ও ইউনিসেফের এই জরিপ এমআইসিএস-২০২৫। প্রায় ৬৩ হাজার পরিবারের ওপর করা এই বিশাল জরিপ দেশের শিশুদের স্বাস্থ্যের এক কঠিন সত্য তুলে ধরেছে। এ যেন বাংলাদেশের ঘরে ঘরে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতার এক পূর্ণাঙ্গ এক্সরে।

ফলাফলে দেখা গেছে—১২–৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮%—রক্তে অতিরিক্ত সীসা। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ৮%—বিষাক্ত ধাতুর প্রভাব। ধনী পরিবারের শিশুদেরও ৫০% আক্রান্ত‌। দরিদ্র পরিবারে ৩০%। দারিদ্র্য যেন এখানে কোনো ঢাল নয়। সীসা প্রবেশ করেছে সবার ঘরে—মেঝেতে, রঙে, মাটিতে, পানিতে, খেলনায়, এমনকি খাবারে।

অগ্রগতি সম্ভব, কিন্তু বিষের ছোবল এখনও আছে—ইউনিসেফ।

ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্সের কণ্ঠ ছিল দৃঢ়, তবে উদ্বেগময়। তিনি বললেন, ‘বাল্যবিয়ে কমেছে, শিশুমৃত্যুও কমেছে—প্রমাণ এটি যে অগ্রগতি সম্ভব। কিন্তু সীসা দূষণ, শিশুশ্রম আর বাড়তে থাকা সিজারিয়ান অপারেশন লাখো শিশুকে তাদের সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত করছে।’ তার কথায় যেন সেই নীরব ক্ষোভ—রাষ্ট্র এগোচ্ছে, কিন্তু শিশুদের মাথায় অদৃশ্য শিকল রয়ে গেছে।

নতুন তথ্য, নতুন আতঙ্ক: অ্যানিমিয়া ও ভারী ধাতুর পরীক্ষা প্রথমবার।

পরিসংখ্যান বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার জানালেন,
প্রথমবারের মতো গর্ভবতী নারী ও ছোট শিশুদের রক্তে অ্যানিমিয়া ও ভারী ধাতুর পরীক্ষা এই জরিপে যুক্ত হয়েছে। ডেটাগুলো ছিল স্পষ্ট এবং বেদনাদায়ক—কম ওজনের শিশু ৯.৮% থেকে বেড়ে ১২.৯% মায়েদের অ্যানিমিয়া—৫২.৮% কিশোরী জন্মহার—৮৩ থেকে বেড়ে ৯২। শিশুশ্রম—৬.৮% থেকে বেড়ে ৯.২%, আরও ১২ লাখ শিশু ঝুঁকিতে। সহিংসতা—৮৬% শিশু কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার।
এই পরিসংখ্যানগুলো যেন একেকটি আর্তনাদ—শব্দহীন, কিন্তু কানে বেজে ওঠে।

নিরাপদ পানি—দেশের ১০ কোটি মানুষ বঞ্চিত

জরিপে উঠে এসেছে আরেক ভয়ংকর তথ্য—
বাংলাদেশের ১০ কোটির বেশি মানুষ নিরাপদ পানির সুযোগ থেকে বঞ্চিত। পানির ৫০% উৎস দূষিত, গৃহস্থালির ৮০% পানি ই. কোলাই সন্দূষিত।
জলবায়ুগত বিপদে ১০.২% পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত।
এ যেন আগুন থেকে বাঁচতে পানিতে ঝাঁপ দেওয়া—কিন্তু সেই পানিও বিষাক্ত।

স্কুলে ভর্তি বাড়লেও শেখার হার কম।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এক নির্মম ছবি ফুটে ওঠে—
ভর্তি হার ৮০%, কিন্তু মৌলিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না বহু শিশু। প্রাথমিক স্কুলগামী শিশুদের ৬–৭% স্কুলের বাইরে। অনেকেই পড়তে জানে, কিন্তু বোঝে না—এ যেন অন্ধকারে বই ধরে থাকা।

প্রতি এক ডলারের বিনিয়োগে নয়গুণ লাভ—তবু বিনিয়োগ কম। শিশু সুরক্ষায় বিনিয়োগ যে কতটা ফলপ্রসূ—জরিপ তা স্পষ্ট করেছে। তবে রাষ্ট্রের অদৃশ্য দেয়ালের মতোই আছে—দুর্বল সেবাপ্রদান, ভঙ্গুর নীতি, আর অসচেতনতা।

Manual7 Ad Code

এক অদৃশ্য যুদ্ধ—যেখানে শত্রু সীসা।

রিপোর্ট শেষ হলে এক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল। মনে হচ্ছিল, পুরো কক্ষ এক অদৃশ্য শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে—যে নেই, কিন্তু সবকিছু দখল করে নিয়েছে।
সীসা কোনো স্লোগান তোলে না, মিছিল করে না, কিন্তু ছায়ার মতো শিশুদের শরীরে ঢুকে পড়ে—প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ।

একজন বিশ্লেষক ফিসফিস করে বললেন, ‘এটা শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়; এটি বুদ্ধিবৃত্তিক দারিদ্র্যের আগাম বার্তা।’

Manual8 Ad Code

রবিবার সকালের সেই ভারী আকাশ দিনশেষে আরও ভারী হয়ে ওঠে। রিপোর্টের ফলাফল শুধু পরিসংখ্যান নয়—এ যেন দেশের ভবিষ্যতের আয়নায় ধুলো জমার চিত্র।
সেই আয়না পরিষ্কার না হলে, হয়তো একদিন আমাদেরই বলতে হবে—’আমরা সতর্ক হয়েছিলাম, কিন্তু পদক্ষেপ নিইনি।’

বাংলাদেশের শিশু—দেশের ভবিষ্যৎ—আজ সীসার অদৃশ্য বেড়াজালে। প্রশ্ন শুধু একটাই—কবে আমরা এই নীরব যুদ্ধে সত্যিকারের অস্ত্র তুলে নেব?

Manual3 Ad Code

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code