২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৮ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

ঋণের বোঝা, ক্ষমতার বলয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঋণগ্রহীতা প্রার্থীরা কি আইনের ঊর্ধ্বে?

editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৬, ০৬:১৩ অপরাহ্ণ
ঋণের বোঝা, ক্ষমতার বলয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঋণগ্রহীতা প্রার্থীরা কি আইনের ঊর্ধ্বে?

Manual3 Ad Code

ঋণের বোঝা, ক্ষমতার বলয়
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঋণগ্রহীতা প্রার্থীরা কি আইনের ঊর্ধ্বে?

লোকমান ফারুক, রংপুরঃ জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হল। সকালটা ছিল অন্যদিনের মতোই চা, ক্যামেরা, নোটবুক আর মাইক্রোফোনে ভরা। কিন্তু পর্দার পেছনে যে সংখ্যাগুলো ভেসে উঠল, সেগুলো শুধু পরিসংখ্যান ছিল না ওগুলো ছিল রাষ্ট্রের অর্থনীতির নৈতিকতার আয়না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন জানাল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ২ হাজার ২৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫১৯ জন ঋণগ্রহীতা। অর্থাৎ প্রতি চারজন প্রার্থীর একজন ব্যাংকের টাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ভোটের লাইনে। তাদের মধ্যে ৭৫ জনের ঋণ পাঁচ কোটি টাকার বেশি। সংখ্যার ভাষায় এটি ১৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ। বাস্তবতায় এটি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা এক শ্রেণির দীর্ঘদিনের চর্চা। সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রহীতা প্রার্থী রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) ১৬৭ জন। মোট ঋণগ্রহীতার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।

Manual2 Ad Code

ঋণ কমেছে, প্রশ্ন কমেনি

Manual8 Ad Code

সুজন বলছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদের তুলনায় এবার ঋণগ্রহীতা প্রার্থীর হার কিছুটা কমেছে। তখন হার ছিল ২২ দশমিক ৮৩ শতাংশ, এবার তা নেমে এসেছে ২০ দশমিক ৯৩ শতাংশে। কিন্তু প্রশ্ন হলো কমেছে কি দায়? নাকি শুধু সংখ্যা? কারণ, একই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরেক বাস্তবতা প্রার্থীদের প্রায় অর্ধেকই স্বল্প আয়ের। ৮৩২ জনের বার্ষিক আয় পাঁচ লাখ টাকার নিচে বিপরীতে, ৯৫ জনের আয় এক কোটি টাকার বেশি। এই বৈপরীত্য কোনো কাকতাল নয়; এটি নির্বাচনী রাজনীতির শ্রেণিগত বিভাজনের দলিল।

আইনে যা বলা আছে, বাস্তবে যা ঘটে

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ একটি স্পষ্ট আইন।
ধারা ১২(ঠ)(ড)(ঢ) বলছে, কেউ নির্বাচিত হবার যোগ্য নন যদি কৃষিঋণ ছাড়া ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হন; এমন কোম্পানির পরিচালক হন, যে কোম্পানি ব্যাংকের ঋণ শোধ করেনি; বিদ্যুৎ, পানি, টেলিফোন বা সরকারি সেবার বিল বকেয়া রাখেন। তবু প্রশ্ন থেকে যায় এই ৫১৯ জন কীভাবে মনোনয়ন পেলেন? কে যাচাই করল? আর কেন চোখ ফিরিয়ে নিল?

Manual5 Ad Code

আয় যখন ক্ষমতার ভাষা

সুজনের তালিকায় শীর্ষ আয়কারীদের দিকে তাকালে একটি রাজনৈতিক মানচিত্র স্পষ্ট হয়। শীর্ষে কুমিল্লা–৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী জাকারিয়া তাহের। বার্ষিক আয় প্রায় ৬০ কোটি টাকা। দ্বিতীয়—টাঙ্গাইল–১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আসাদুল ইসলাম—৪০ কোটি টাকা। তৃতীয় লক্ষ্মীপুর–১ আসনের ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী জাকির হোসেন পাটওয়ারী ১৯ কোটি টাকা। এই তালিকার শীর্ষ দশের ছয়জনই বিএনপি মনোনীত। এই আয় কি শুধু ব্যবসার ফল? নাকি ক্ষমতার নিকটতা তার গোপন সহায়ক?

জুলাই অভ্যুত্থান’ ও ভোটের নৈতিকতা

মন্তব্য জানতে চাইলে এক ছাত্র প্রতিনিধি বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থান ছিল আওয়ামী ফ্যাসিবাদ নির্মূলের এক অগ্নিগর্ভ অধ্যায়। আর অভ্যুত্থান মানেই পরিবর্তন। এখন ‘হ্যাঁ’ ভোটের মধ্য দিয়েই ফ্যাসিস্ট তৈরির কাঠামো চুরমার করতে হবে।”
একজন শ্রমিক নেতা আরও সরাসরি বলেন, “ব্যাংকের টাকা পরিশোধ না করাও জনগণের প্রতি জুলুম। সেই জুলুমের ঘানি সবাইকে টানতে হয়। এর জবাবও ‘হ্যাঁ’ ভোটেই দিতে হবে।” এই বক্তব্যগুলো শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয় এগুলো একটি সামাজিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ক্ষমতার স্বভাব, অপেক্ষার রাজনীতি। একজন বিশ্লেষক নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলেন, “ঋণ খেলাপি হওয়া ক্ষমতার আশেপাশে থাকা কিছু মানুষের স্বভাব। শেষ পর্যন্ত এদের বিরুদ্ধে কী সিদ্ধান্ত আসে, তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে।” এই ‘অপেক্ষা’ই বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে পরিচিত শব্দ। আইন আছে, তথ্য আছে, তালিকা আছে কিন্তু সিদ্ধান্ত সবসময় ভবিষ্যতের অনিশ্চিত কালে আটকে থাকে।

শেষ প্রশ্ন

যে রাষ্ট্রে একজন কৃষক ঋণের কিস্তি না দিতে পারলে ঘর হারায়। সেই রাষ্ট্রে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে নির্বাচনে দাঁড়ানো কীভাবে বৈধ হয়? ব্যাংকের টাকা না দিয়ে কারা নিরাপদ থাকছে? আর শেষ পর্যন্ত কার টাকায় গণতন্ত্রের এই উৎসব?
উত্তরগুলো এখনো ভোটের বাক্সে নয় সেগুলো লুকিয়ে আছে ক্ষমতার নীরব সমঝোতায়। সত্য সামনে আছে। এখন প্রশ্ন দেখবে কে?

Manual4 Ad Code

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code