লোকমান ফারুক, রংপুর
শীতের দুপুর। রংপুর সদর উপজেলার সদ্যপুস্কুরণী ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রাম। উঠোনজুড়ে সারি সারি মানুষ-নারী, পুরুষ, তরুণ, বৃদ্ধ। কারও চোখে কৌতূহল, কারও ভেতরে অনিশ্চয়তা, আবার কারও মধ্যে দীর্ঘদিনের জমে থাকা
প্রশ্ন: এই ভোটে কি সত্যিই কিছু বদলাবে? ঠিক সেই মুহূর্তে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি কণ্ঠ স্পষ্ট করে উচ্চারিত হলো-“সঠিক নেতৃত্ব বাছাইয়ের মূল দায়িত্ব জনগণের।”
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রাক্কালে আয়োজিত এক উঠান বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুল জলিল বলেন, ঘুষ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক ও যোগ্য ব্যক্তিকে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আনাই রাষ্ট্র সংস্কারের প্রথম শর্ত।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্র কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়, রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ। ভোট প্রদানের মাধ্যমেই সেই মালিকানা বাস্তবে রূপ নেয়। ভোটই হলো সেই চাবি, যা রাষ্ট্র পরিচালনার দরজা খুলে দেয়, বললেন তিনি।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) দুপুরে অনুষ্ঠিত এই উঠান বৈঠকের আয়োজন করে রংপুর জেলা তথ্য অফিস, গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের সহযোগিতায়। উদ্দেশ্য একটাই; ভোটারদের সামনে প্রক্রিয়া নয়, দায়িত্বের কথা তুলে ধরা।
মহাপরিচালক তার বক্তব্যে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের পদ্ধতি ব্যাখ্যার পাশাপাশি সংস্কার প্রক্রিয়া এবং আলোচিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের সূক্ষ্ম দিকগুলো তুলে ধরেন।
তার ভাষায়, “একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য সংসদের উচ্চ ও নিম্নকক্ষ গঠন, নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি এবং ইন্টারনেট শাটডাউন প্রতিরোধের মতো সংস্কার কাগজে নয়; বাস্তবে রূপ দিতে হলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে গণমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
তিনি শহীদ আবু সাঈদের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “আবু সাঈদের আত্মত্যাগ কোনো একক ঘটনা নয়-তা ছিল ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের দাবিতে ছড়িয়ে পড়া এক আগুনের স্ফুলিঙ্গ।
জনগণের সেবক হওয়ার মানসিকতা যাদের আছে, তাদের নির্বাচিত করাই হবে শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা, বললেন তিনি।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মহাপরিচালক জানান, ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে দেশজুড়ে বহুমুখী প্রচার কার্যক্রম চলছে। উঠান বৈঠক, ভোটের গাড়ির পর আগামী ২০ জানুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে ‘ভোটের রিকশা’।
এই কর্মসূচির মাধ্যমে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়নে পৌঁছাবে গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের বিশেষ বার্তা।
রংপুর জেলা তথ্য অফিসের পরিচালক ড. মো. মোফাকখারুল ইকবালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আধুনিক তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান, গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের পরিচালক (কারিগরি) মীর মো. আসলাম উদ্দিন, পরিচালক (প্রশাসন) সৈয়দ এ মু’মেন, উপপরিচালক নাসিমা খাতুনসহ জেলা ও আঞ্চলিক তথ্য অফিসের কর্মকর্তারা।
উঠান বৈঠকে পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বৈঠক শেষে মহাপরিচালক রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আবু সাঈদ গেটে তরুণ ও নারী ভোটারদের সঙ্গে অংশ নেন ‘টেন মিনিটস ব্রিফ’ ও’ভোটালাপে’।
সেখানে প্রশ্ন উঠেছে, প্রত্যাশা এসেছে, আর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে সরাসরি মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে।
দিন শেষে কেশবপুর গ্রামের উঠোন ফাঁকা হয়। কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যায়—এই ভোট কি কেবল আনুষ্ঠানিকতা হবে, নাকি সত্যিই জনগণের হাতে ফিরবে রাষ্ট্রের চাবি?
উত্তরটি এখন আর বক্তৃতায় নয়, ভোটকেন্দ্রেই লেখা হবে।
Sharing is caring!