১৭ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা সফর, ১৪৪৮ হিজরি

খুঁড়িয়ে চলছে রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র, প্রতিশ্রুতি ফাইলবন্দি

admin
প্রকাশিত ডিসেম্বর ৯, ২০২৫, ০৯:৫৬ অপরাহ্ণ
খুঁড়িয়ে চলছে রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র, প্রতিশ্রুতি ফাইলবন্দি

Manual2 Ad Code

লোকমান ফারুক, রংপুর

রোকেয়ার জন্মভিটার প্রবেশদ্বার পেরোতেই মনে হয়—সময় এখান থেকে বহু আগে চলে গেছে। দালানের দেয়ালে শ্যাওলা, দরজার কপাট নুয়ে পড়েছে, জানালার কাচ ভাঙা। একসময়ের স্বপ্ন-প্রতিষ্ঠান এখন যেন কালের ধুলোয় চাপা দেওয়া নিঃশব্দ এক আক্ষেপ।

Manual4 Ad Code

১৪৪ তম জন্মবার্ষিকীর সকালেও রোকেয়ার স্মৃতিকেন্দ্র রয়ে গেছে সেই একই ছবিতে—অচল, পরিত্যক্ত, ফাইলবন্দি, প্রতিশ্রুতির বোঝা বইতে থাকা একটি সরকারি স্থাপনা। অথচ এখানেই জন্ম নিয়েছিলেন নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।

সেই নারীর জন্মভিটাকে কেন্দ্র করে ১৯৯৭ সালে সরকারের শত প্রতিশ্রুতির সুরে যাত্রা শুরু হলেও ২৪ বছর পার হয়ে গেছে—স্বপ্ন বিকশিত হয়নি, শুধু ক্ষয়ে গেছে। তবু আশার আলো জ্বলে আছে এক কোণে। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে স্মৃতিকেন্দ্রটির আনুষ্ঠানিক সংযুক্তি হতে যাচ্ছে—যা স্থানীয়দের মনে খানিকটা আলো জ্বালালেও, তাদের দীর্ঘ ক্ষোভ আর বঞ্চনার ইতিহাস সেই আলোকে অনেকটাই ম্লান করে দেয়। জন্মভিটায় জন্ম নেওয়া বিভ্রান্তি ও বৈপরীত্য বাংলার আধুনিক ইতিহাসে রোকেয়া একটি বিবেকের নাম। কিন্তু সেই বিবেকের জন্মভিটা এখন রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার প্রতিচ্ছবি।

এখানে উচ্চারণ করা হয় আরেকটি প্রশ্ন—রোকেয়ার নামের সঙ্গে ‘বেগম’ যুক্ত করার রাষ্ট্রীয় অভ্যাস কি তাঁর জীবনদর্শনের পরিপন্থী নয়? স্থানীয় গবেষকরা বলছেন—রোকেয়া নিজেই ‘বেগম প্রথা’র বিরুদ্ধে আজীবন লিখেছেন। তবু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই তাঁর নামের সাথে ‘বেগম’ সাঁটানো হয়েছে। যা এক ধরনের বৈপরীত্য, প্রতিটি রোকেয়া দিবসেই আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

Manual1 Ad Code

২৪ বছরের অবহেলা: এক প্রতিষ্ঠানের ধীর মৃত্যু ২০০১ সালে স্মৃতিকেন্দ্রটির উদ্বোধনের পর প্রশাসনিক জটিলতা আর রাজনৈতিক অনীহা প্রতিষ্ঠানটিকে পর্যায়ক্রমে স্তব্ধ করে দেয়। ২০১৯ সালে সীমিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হলেও করোনায় তা বন্ধ হয়ে যায়। ২০২২ সালে সংগীত কোর্স চালু হলেও কয়েক মাসের মধ্যেই বন্ধ হয়ে পড়ে।

রোকেয়ার জন্মভিটায় এসে দর্শনার্থীরা শুধু হতাশাই পান—ভাঙা দেয়াল, তালাবদ্ধ কক্ষ, মসজিদ-দিঘীর অনাদর, বেহাত হওয়া সম্পত্তি ফিরে না পাওয়া, আঁতুর ঘর সংস্কার না হওয়া—সব মিলিয়ে অনাদরের এক দীর্ঘ ইতিহাস। দর্শনার্থী মৌমিতা ইসলাম ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন—’রোকেয়াকে আমরা পড়ছি, কাজ করছি। অথচ তাঁর জন্মভিটায় এভাবে অবহেলা—এটা অপমানজনক। দেয়ালগুলো ধসে পড়ছে, ইট ঝরছে। আমরা চাই সংরক্ষণ হোক।’

Manual5 Ad Code

স্থানীয় শামীম পারভেজ বলেন—’এমন অবকাঠামো, অথচ কার্যক্রম নেই। কক্ষগুলো তালাবদ্ধ, জানালা ভাঙা। হঠাৎ এলে মনে হবে ভুতুরে বাড়ি।’ আর রিজিয়া পারভীন বলেন—’রোকেয়ার দেহাবশেষ আনার প্রতিশ্রুতি দেড় দশক ধরে শুনছি। কিন্তু উদ্যোগ শূন্য। আমরা তাঁর কবরে ফুল দিতে চাই—কিন্তু তিনি এখানে নেই।’ ‘

প্রতিশ্রুতির রাজনীতি’ ও বঞ্চনা রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল আক্ষেপ করে বলেন—’প্রতি বছর কর্মকর্তারা দেহাবশেষ আনার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু চিঠি চালাচালিও হয় না। সবই ফাইলবন্দি।

এ অবহেলা পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের ফল।’ ফাইলবন্দি হওয়া প্রতিশ্রুতি যেন রোকেয়ার জন্মভিটায় জমে থাকা শ্যাওলার মতো—খসে পড়ছে ইট, কিন্তু নড়ছে না আমলাতন্ত্রের অনীহা। নামের বিকৃতি: আরেক অদৃশ্য লড়াই রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন—’রোকেয়া কখনোই বেগম শব্দটি ব্যবহার করেননি।

স্বামীর নামের মিল রেখে তিনি লিখতেন ‘রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন’। রাষ্ট্রীয়ভাবে বেগম যুক্ত করা ভুল। যার নাম তিনি নিজে গ্রহণ করেননি, সেটি তার নাম নয়।’ নামের এই বিকৃতি সংশোধনের দাবিতে সচেতন নাগরিকরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমির হস্তক্ষেপ চান। শেষমেশ আশার আলো? রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. শওকাত আলী জানান—’৯ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমির সঙ্গে সমঝোতা সই হচ্ছে। গবেষণা, চর্চা, প্রচার—সব মিলিয়ে নতুন অধ্যায় শুরু হবে।’

বাংলা একাডেমির সহপরিচালক আবিদ করিম মুন্না জানান—’আজ থেকে শিশুদের চিত্রাঙ্কন, সংগীত, নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণ চালু হচ্ছে। লাইব্রেরি সমৃদ্ধ করা হয়েছে।’ তবে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে—উদ্বোধন আর প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বাস্তবায়ন দেখা সবচেয়ে কঠিন কাজ।

রোকেয়ার আলো ও জন্মভিটার অন্ধকার রোকেয়া নারীমুক্তির আলো জ্বালিয়েছিলেন নিজের কাগজ-কলমে, প্রতিরোধের শক্তিতে। সেই আলো আজও ঝলমলে। কিন্তু তাঁর জন্মভিটায় অন্ধকার কাটছে না—কারণ সেই আলো বহন করার দায়িত্বে যারা আছেন, তারা বছরের পর বছর ফাইলের নিচে চাপা রেখেছেন প্রতিশ্রুতির আলো।

Manual1 Ad Code

রোকেয়া দিবসে স্মৃতিকেন্দ্রের বেদিতে ফুল পড়বে, বক্তৃতা হবে, র্যালি হবে—কিন্তু মূল প্রশ্নটি থেকে যায়— নারী জাগরণের অগ্রদূতের স্মৃতিকে আমরা কি সত্যিই সম্মান দিতে চেয়েছি? নাকি প্রতিশ্রুতির ধোঁয়ায় তাকে বঞ্চিতই রেখেছি?

দিনশেষে রোকেয়ার জন্মভিটা যেন দাঁড়িয়ে আছে আমাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বহীনতার নীরব স্মারক হয়ে— বাঙালির নারী জাগরণের আলো, আর তার নিজের ঘর অন্ধকারে ডুবে।

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code