২৮শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৪ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি

উত্তরের জনপদে শীতের দাপট, হাসপাতালের বারান্দায় মৃত্যু গুনছে মানুষ

admin
প্রকাশিত জানুয়ারি ৮, ২০২৬, ০২:০৯ অপরাহ্ণ
উত্তরের জনপদে শীতের দাপট, হাসপাতালের বারান্দায় মৃত্যু গুনছে মানুষ

Manual7 Ad Code

লোকমান ফারুক, রংপুর

ভোর নামলেই উত্তরাঞ্চলের জনপদগুলো নিস্তব্ধ হয়ে পড়ছে। কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ছে রাস্তা, ক্ষেত আর মানুষের মুখ। পাঁচ দিন পর সূর্যের দেখা মিললেও তাতে উষ্ণতা নেই—দুই ঘণ্টা না যেতেই আলো নিভে যাচ্ছে। শীতের এই নীরব দাপটে রংপুরসহ বিভাগের আট জেলায় জনজীবন বিপর্যস্ত।

চলতি শীত মৌসুমে বুধবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে নওগাঁয়—৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি। এ ছাড়া রংপুর বিভাগের আরও পাঁচ জেলায় তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রির ঘরে নেমে এসেছে। আবহাওয়া অফিস বলছে, এটি কেবল শুরু। এই শীতে সবচেয়ে ভারী চাপটা পড়েছে হাসপাতালের শয্যায়। গত তিন দিনে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিউমোনিয়া, সর্দি-জ্বর ও কোল্ড ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৪৮ জন—এর মধ্যে ১০ জন বয়স্ক নারী-পুরুষ এবং ৩৮ জন শিশু। হাসপাতালের সর্দার অফিস সূত্রে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মমতাজ উদ্দিন।

Manual6 Ad Code

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভেতরের চিত্র আরও ভয়াবহ। শিশু বিভাগের তিনটি ওয়ার্ডসহ মেডিসিন ওয়ার্ডে কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা নেই। পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, রোগীর চাপে ওয়ার্ডগুলো পূর্ণ হয়ে গেছে।
প্রতিদিন আউটডোরে শত শত শিশু শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসছে। শিশুদের কোলে নিয়ে স্বজনদের ভিড় হাসপাতালের করিডোর ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বাইরে পর্যন্ত। শীত যেন এখানে শুধু আবহাওয়া নয়—একটি নিরব দুর্যোগ।

Manual3 Ad Code

রংপুর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বুধবার সকাল ৯টায় ঠাকুরগাঁয় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। নীলফামারীর ডিমলায় ৮ দশমিক ৭, দিনাজপুরে ৮ দশমিক ৭, রংপুরে ৮ দশমিক ৪, সৈয়দপুরে ৮ দশমিক ৫, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৮ দশমিক ৫, লালমনিরহাটে ৯ দশমিক ৩ এবং গাইবান্ধায় ৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। সহকারী আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান, মধ্যরাত থেকে কুয়াশা বৃষ্টির মতো পড়ছে। সঙ্গে বইছে হিমেল বাতাস। সূর্য দেখা দিলেও তা দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হচ্ছে না। আবহাওয়া অধিদপ্তর চলতি সপ্তাহে তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রির নিচে নামার আগাম সতর্কতা দিয়েছে। এতে একাধিক মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Manual1 Ad Code

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন সহায়-সম্বলহীন ও ভাসমান মানুষরা। রংপুর ত্রাণ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, এবার শীতে হতদরিদ্রদের জন্য শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। শিশুদের গরম কাপড়ের ব্যবস্থাও নেই।
বিভাগীয় প্রশাসকের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আট জেলার জন্য শীতবস্ত্র বরাদ্দ চেয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে শীতবস্ত্রের অভাবে দুর্ভোগ বাড়ছে। সামাজিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগও এবার চোখে পড়ছে না।

Manual3 Ad Code

উত্তরের এই জনপদে শীত নামলে রাত লম্বা হয়, দিন ছোট হয়ে আসে। তাপমাত্রা কমে—আর তার সঙ্গে কমে মানুষের সহনশীলতা। হাসপাতালের বারান্দায়, কুয়াশায় ঢাকা রাস্তায় আর খোলা আকাশের নিচে তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—শীত কি প্রকৃতির নিয়ম, নাকি ব্যবস্থার ব্যর্থতা?

কুয়াশা এখনও ঘন। যন্ত্রে তাপমাত্রা নামছে। আর হাসপাতালের খাতায় প্রতিদিন যোগ হচ্ছে নতুন সংখ্যা।

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code