২৩শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

রাস্তায় ‘মরণফাঁদ’—রংপুরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা সড়কের দায় কার?

editor
প্রকাশিত মার্চ ২৩, ২০২৬, ০১:০০ অপরাহ্ণ
রাস্তায় ‘মরণফাঁদ’—রংপুরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা সড়কের দায় কার?

Manual7 Ad Code

রাস্তায় ‘মরণফাঁদ’—রংপুরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা সড়কের দায় কার?

লোকমান ফারুক, রংপুরঃ রংপুর শহরের জাহাজ কোম্পানি মোড় পেরিয়ে সাতমাথার দিকে হাঁটা শুরু করলেই বোঝা যায় এটি কোনো সাধারণ সড়ক নয়। এটি একটি দৃশ্যমান সংকটের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হওয়া। পায়ের নিচে ভেঙে পড়া পিচ, হঠাৎ ডেবে যাওয়া খোয়া, আর বৃষ্টির পানিতে ঢেকে থাকা গর্ত সবকিছু মিলিয়ে পথটি যেন নিজেই সতর্ক করে দেয়: এখানে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ, এবং এই ঝুঁকি আকস্মিক নয়। জাহাজ কোম্পানি মোড় থেকে মাহিগঞ্জ সাতমাথা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এই সড়ক এখন একটি ভৌত অবকাঠামোর চেয়ে বেশি কিছু এটি অব্যবস্থাপনার একটি খোলা দলিল। প্রতিটি খানাখন্দ, প্রতিটি ধুলোর স্তর, প্রতিটি অনিয়মিত পৃষ্ঠা যেন একটি দীর্ঘস্থায়ী অবহেলার ধারাবাহিকতা তুলে ধরে—যা পরিকল্পনার ঘাটতি, বাস্তবায়নে স্থবিরতা এবং জবাবদিহির অনুপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।

ঈদের প্রাক্কালে এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চলাচল করছে। যাত্রীরা বাড়ি ফিরছে, ব্যবসায়ীরা পণ্য আনছে, কেউবা জরুরি রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এই পথটি যেন চলাচলের জন্য প্রস্তুত নয়। কোথাও পিচ উঠে গেছে, কোথাও গভীর গর্ত, আবার কোথাও পানি জমে দৃশ্যমান বিপদকে আড়াল করে রেখেছে। ফলে প্রতিটি যাত্রাই হয়ে উঠছে অনিশ্চিত। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সড়কজুড়ে যানবাহনের গতি অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। অটো-রিকশা দুলতে থাকে, রিকশার ভারসাম্য হারায়, মোটরসাইকেল চালকরা হঠাৎ ব্রেক করতে বাধ্য হন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রায় প্রতিদিনই এখানে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। তবে এসব ঘটনা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নথিভুক্তি নেই।

মাহিগঞ্জ, যা রংপুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসাকেন্দ্র, এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল। ব্যবসায়ীরা জানান, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং ক্রেতা উপস্থিতিও কমে গেছে। এর প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতিতে সরাসরি পড়ছে।
অটোচালক হবিবর রহমান বলেন, “এই রাস্তায় গাড়ি চালানো মানে প্রতিদিন ঝুঁকি নেওয়া। যাত্রীরা অসস্থিতে থাকে, গাড়ি নষ্ট হয়—কিন্তু দেখার কেউ নেই।”
যাত্রী ইউনুস মিয়া বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে শুধু আশ্বাস শুনছি। বাস্তবে কোনো পরিবর্তন দেখছি না।”

Manual4 Ad Code

এই সড়ক নিয়ে স্থানীয়দের অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। গত বছরের ২০ জুলাই এলাকাবাসী প্রতীকী ‘গায়েবানা জানাজা’ আয়োজন করে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। কিন্তু তাতেও দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বলেন, “এটি এখন একটি ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক। প্রতিদিন মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।”
প্রশাসনিক নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই সড়ক সংস্কার নিয়ে একাধিকবার আলোচনা ও প্রস্তাব উত্থাপন হয়েছে। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বরাদ্দ অনুমোদন, ঠিকাদারি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবে কাজটি দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত রয়েছে—যদিও এসব তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

Manual4 Ad Code

স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করছেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রমে ধীরগতি এসেছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলছে। তবে এই পরিস্থিতি কতদিন চলবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। ট্রাকচালক আমিন মিয়া বলেন, ” এই কয়েক কিলোমিটার যেতে যে সময় আর কষ্ট হয়, তা অনেক দূরের পথের চেয়েও বেশি। রোগী নিয়ে গেলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।” স্বাস্থ্যঝুঁকিও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালির কারণে স্থানীয়দের মধ্যে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তবে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বা পরিবেশ কর্তৃপক্ষের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ পাওয়া যায়নি।

Manual6 Ad Code

রংপুর সিটি কর্পোরেশনের নবনিযুক্ত প্রশাসক অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন নবী ডন বলেন, “ঈদের পর দ্রুত সময়ের মধ্যে সংস্কার কাজ শুরু করা হবে।” কিন্তু ‘ঈদের পর’ এই প্রতিশ্রুতি স্থানীয়দের কাছে নতুন নয়। এটি একটি পুনরাবৃত্ত প্রতিশ্রুতি, যার বাস্তবায়ন অনিশ্চিত রয়ে গেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ নগর সড়ক, যা প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের চলাচল নিশ্চিত করে এবং একটি আঞ্চলিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে সেটি যদি দীর্ঘ সময় ধরে অবহেলিত থাকে, তাহলে প্রশ্নগুলো স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে এটি কি শুধুই প্রশাসনিক ব্যর্থতা? নাকি দায় এড়ানোর একটি কাঠামোগত সংস্কৃতি?
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই দীর্ঘ নীরবতার ভেতরে কারা দায়মুক্ত, আর কারা প্রতিদিন তার মূল্য দিচ্ছে?

Manual1 Ad Code

Sharing is caring!

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code