
লোকমান ফারুক রংপুর: রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ছয়টি শহরে, ছয়টি সরকারি দপ্তরে জমা পড়ে একটি স্মারকলিপি। ভাষা এক, অভিযোগ এক-হোটেল-রেস্তোরাঁয় শ্রম আইন নেই, নিম্নতম মজুরি কাগজে বন্দী। স্মারকলিপির প্রাপক ছিলেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ছয়জন উপ-মহাপরিদর্শক। সেদিন কেউ স্মারকলিপি ফেরত দেননি। কিন্তু তার পর, কল কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের-রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের কার্যালয় সমূহ ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়।
কর্মবিরতি স্থগিত, প্রশ্ন স্থগিত নয়
১৪ জানুয়ারি ২০২৫-এ দেশব্যাপী হোটেল–রেস্তোরাঁ শ্রমিকদের কর্মবিরতির কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল।
কিন্তু তার আগেই ঢাকায় ঘটে একটি ঘটনা যা পরবর্তীতে পুরো আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয়।
শ্রম আইন ও নিম্নতম মজুরি বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাথে, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং মালিকপক্ষের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—কর্মবিরতি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
সরকার ও পরিদর্শন অধিদপ্তর পরিদর্শনের আশ্বাস দেয়। এই সিদ্ধান্তের কথা কেন্দ্রীয়ভাবে ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো , পরিদর্শন কোথায়? ঢাকায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর সক্রিয় কিন্তু বিভাগে নীরবতা। ত্রিপক্ষীয় আলোচনার পর কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ঢাকার কিছু হোটেল–রেস্তোরাঁ পরিদর্শনের তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিভাগীয় শহর, জেলা শহর ও উপজেলা পর্যায়ে, কোনো পরিদর্শনের ঘোষণা নেই। কোনো নোটিশ নেই, মামলা নেই; আইন কি এখানে ইচ্ছাকৃতভাবেই নীরব!
এই প্রতিবেদক ১২ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে ছয়জন উপ-মহাপরিদর্শকের কাছে লিখিত প্রশ্নমালা পাঠান—
পরিদর্শন হয়েছে কি না, হলে কোথায়, কী ফলাফল।
আজও' কোনো লিখিত উত্তর নেই। কোনো দাপ্তরিক ব্যাখ্যা নেই, ঢাকায় রাষ্ট্র সক্রিয়; বিভাগীয় শহরগুলোতে যেন ছুটিতে।
মাঠের বাস্তবতা বদলায়নি
এই নীরবতার মধ্যেই প্রতিবেদক যোগাযোগ করেন, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের সব জেলা শহরের হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা ও কর্মীদের সঙ্গে। কর্মবিরতি স্থগিত হলেও বাস্তবতা বদলায়নি। রংপুরের এক বাবুর্চি বলেন-"কর্মবিরতি উঠেছে, কিন্তু আমাদের কাজের সময় বদলায়নি।" রাজশাহীর এক ওয়েটারের ভাষায়-"ঢাকায় পরিদর্শন হলে কী হবে, এখানে তো কেউ আসে না।"বগুড়ার এক সহকারী শ্রমিক জানান-"মালিক বলেছে, সরকার তো কিছুই করেনি।"
সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী—৮০ শতাংশের বেশি হোটেল–রেস্তোরাঁয় দৈনিক ১০–১২ ঘণ্টা কাজ,
ওভারটাইম নেই, নিয়োগপত্র নেই, ছুটি ও নিম্নতম মজুরি কাগুজে অধিকার। যেন ত্রিপক্ষীয় আলোচনা এই অঞ্চলকে ছুঁয়েই দেখেনি।
মালিকপক্ষের আত্মবিশ্বাস কোথা থেকে
মালিকপক্ষের কয়েকজন নেতার বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে ভয়ের অভাব। রাজশাহী বিভাগের এক মালিক সমিতির নেতা বলেন"ঢাকায় চাপ বেশি। বিভাগে তেমন কিছু হয় না।" রংপুরের এক প্রভাবশালী রেস্তোরাঁ মালিকের বক্তব্য—"পরিদর্শন হলে কাগজ ঠিক করা আমাদের জন্য সমস্যা না।"এই আত্মবিশ্বাসের পেছনের কারণ কী?
মাসোহারা’র অভিযোগ: প্রকাশ্যে না বলা চুক্তি
শ্রমিক নেতা, ইউনিয়ন প্রতিনিধি এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্যে উঠে আসে একটি গুরুতর অভিযোগ—বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে অনেক হোটেল_রেস্তোরাঁ মালিক নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শকদের ‘মাসোহারা’ প্রদান করেন। এই অভিযোগ অনুযায়ী_পরিদর্শন আগে থেকে জানা থাকে, হাজিরা ও মজুরি রেজিস্টার সাজানোর সময় পাওয়া যায়। গুরুতর লঙ্ঘন ‘সাধারণ ত্রুটি’ হিসেবে নথিভুক্ত হয়। এ কারণেই, শ্রমিক নেতাদের ভাষায়_"পরিদর্শকরা ধীরগতির, টালবাহানাপূর্ণ এবং কার্যত নিরুত্তর।" এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট উপ-মহাপরিদর্শকদের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ স্পষ্ট। নিম্নতম মজুরি, কর্মঘণ্টা, ওভারটাইম
....সবই বাধ্যতামূলক।
কিন্তু বাস্তবে... আইন মানলে মুনাফার অংশ কমে মালিকের, আইন না মানলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শ্রমিক।
আর নীরব থাকলে প্রশ্ন ওঠে পরিদর্শন ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে।
শেষ প্রশ্ন, যা থেকে যায়
কর্মবিরতি স্থগিত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন স্থগিত হয়নি!ত্রিপক্ষীয় আলোচনার সুফল কেন ঢাকার বাইরে গেল না? বিভাগীয় শহরগুলো কি রাষ্ট্রের মানচিত্রে নেই?
পরিদর্শন ব্যবস্থার এই নীরবতা কি অদক্ষতা, নাকি অঘোষিত সমঝোতা? শ্রমিকরা আজও রান্নাঘরে কাজ করছেন_তেল, ধোঁয়া আর দীর্ঘ সময়ের ভেতর। আর শ্রম আইন? তা এখনো শুধু কাগজেই।
প্রশ্ন থেকেই যায়_এই আইন কাদের রক্ষা করছে?
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক -শেখ তিতুমীর আকাশ।
বার্তা প্রধান : মোঃ সেলিম উদ্দিন
ইমেইল: dailyswadhinbhasha@gmail.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব www.swadhinbhasha.com কর্তৃক সংরক্ষিত।