লোকমান ফারুক,
রংপুরের আঞ্চলিক শ্রম দপ্তরের টেবিলে একটি চিঠি এসে পৌঁছায়, সাধারণ চিঠি। ভাষা ভদ্র, শব্দচয়ন সংযত, কিন্তু প্রতিটি লাইনে লুকিয়ে ছিল অবাধ্য ক্ষোভ ও দীর্ঘদিনের হতাশা।
চিঠির বিষয়, জলঢাকা উপজেলা লেবার ইউনিয়নের বার্ষিক রিটার্ন দাখিল ও কার্যকরী কমিটির নির্বাচন সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রার্থনা।
চিঠির একটি বাক্যই যেন সব বলে দেয়, আমাদেরকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় ফেলে দেওয়া হয়েছে।
এই বাক্যে শুধু দ্বিধা নয়, লুকিয়ে আছে একটি নির্মম বাস্তবতা। ক্ষমতার অপব্যবহারের এক নির্জলা উদাহরণ, যা আইনের নাম করে ট্রাকে মালামাল লোড-আনলোডকারী লেবারদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করছে।আইন যেখানে স্পষ্ট, বাস্তবতা সেখানে উল্টো
শ্রম অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপনের ভাষা স্পষ্ট, লেবার ইউনিয়ন হবে উপজেলা ভিত্তিক। উপজেলা এলাকায়, ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা ভিত্তিক লেবার ইউনিয়ন নিবন্ধন নৈতিক ও আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এই কাঠামো মেনেই জলঢাকা উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ছিল ৩টি উপজেলা ভিত্তিক লেবার ইউনিয়ন।
এই ইউনিয়নগুলো শ্রমিকদের একতাবদ্ধ করে, মজুরি নিরাপত্তা ও অধিকার আদায়ের প্রশ্নে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু ২০২৫ সালের শেষার্ধ থেকে দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে। একই উপজেলায়, পৌরসভা ভিত্তিক আরও ২টি লেবার ইউনিয়ন, ইউনিয়ন পরিষদ ভিত্তিক ৬টি লেবার ইউনিয়ন নিবন্ধন দিয়ে মোট ১১টি লেবার ইউনিয়নের কার্যক্রম শুরু হয়।
এক উপজেলা, ১১টি ইউনিয়ন: বিভ্রান্তির নকশা
নথি বলছে, আঞ্চলিক শ্রম দপ্তর, জলঢাকা উপজেলায়
ইউনিয়ন পরিষদ ভিত্তিক লেবার ইউনিয়ন ৬টি,পৌরসভা ভিত্তিক লেবার ইউনিয়ন ২টি, উপজেলা ভিত্তিক পুরোনো লেবার ইউনিয়ন ৩টি। মোট ১১টি লেবার ইউনিয়নের নিবন্ধন প্রদান করেছে। একটি উপজেলায়, একই শ্রেণীর শ্রমিকদের জন্য ১১টি ইউনিয়ন!
এটি কেবল সংখ্যাগত অস্বাভাবিকতা নয়; এটি একটি বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কাঠামো, যা শ্রমিকদের ঐক্য ভেঙে দেয় এবং দরকষাকষির শক্তি ক্ষীণ করে।
কাগজে শ্রমিক, মাঠে নেই
জলঢাকার মাঠে নামলেই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়। যা কাগজে দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে তার সঙ্গে মিল নেই। একজন সাবেক ইউনিয়ন কর্মকর্তা বলছেন, "জলঢাকা উপজেলায় বাস্তব লেবার সংখ্যা ১১শ থেকে ১২শ’র বেশি নয়। অথচ কাগজে দেখানো হয়েছে কয়েক হাজার। শ্রমিক বাড়েনি, তাহলে সংখ্যা বাড়ানোর পেছনে স্বার্থ কী?"
বিশ্লেষকদের ভাষ্য আরও স্পষ্ট, "মিথ্যা সাধারণ সভার কার্যবিবরণী, একই শ্রমিকের নাম একাধিক ইউনিয়নের সদস্য তালিকায়, জাল স্বাক্ষর ও সাজানো উপস্থিতির কাগজপত্র। এসব কৌশলে কাগজে শক্তি তৈরি করা হয়েছে, মাঠে নয়।" তার মতে, 'এটি কেবল সংগঠন বৃদ্ধি নয়, এটি নির্বাচনী কৌশল। ক্ষমতার বিনিময় এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনৈতিকতার প্রতিফলন।'
ইউনিয়ন কার জন্য?
যদি ইউনিয়ন শ্রমিকের শক্তি হয়, তাহলে এই ব্যবস্থায় শ্রমিক কোথায়? অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন, কর্তৃপক্ষের স্বার্থসন্ধানী কিছু কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা সাজানো নেতা। একজন প্রবীণ শ্রমিকের ভাষায়, " ইউনিয়ন এখন আমাদের রক্ষা করে না। বরং ইউনিয়নের নামেই আমাদের ভাগ করা হয়েছে।'
এই ইউনিয়নগুলো আর শ্রমিকের সংগঠন নেই, এগুলো পরিণত হয়েছে স্বার্থের সংগঠনে, টাকার বিনিময়ে লাইসেন্সপ্রাপ্ত কাঠামোয়।'
শক্তির বিভাজন, সংঘাতের ঝুঁকি
এই অবৈধ ইউনিয়ন বিস্তারের প্রভাব কেবল সংখ্যায় নয়,
এটি শ্রমিকদের সমষ্টিগত শক্তি ভেঙে দিয়েছে।দরকষাকষির ক্ষমতা কমেছে, মজুরি বৃদ্ধির আলোচনা বিভ্রান্ত হয়েছে, একই শ্রমিক একাধিক দলের চাপে পড়েছে; উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঝুঁকি বেড়েছে।
একজন প্রবীণ নেতা বললেন," আগে আমরা এক মুষ্টি ছিলাম। এখন বহু ফাটল। মজুরি নিয়ে দরকষাকষি করতে পারি না।' এটি নিছক বিভাজন নয়, এটি শ্রমিক শক্তি নিষ্ক্রিয় করার সুপরিকল্পিত কৌশল।
নির্বাচনের সময় ‘বিশেষ বিবেচনা’: চাপের অভিযোগ
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সাধারণত কোনো ট্রেড ইউনিয়নের নির্বাচন অনুমোদিত হয় না। এটি প্রচলিত রীতি। কিন্তু পৌরসভা ভিত্তিক লেবার ইউনিয়ন নিবন্ধনের বিরুদ্ধে উপর মহলে অভিযোগ করার পরপরই, আঞ্চলিক শ্রম দপ্তর থেকে একটি পত্র দেওয়া হয়। সাত দিনের মধ্যে ‘বিশেষ বিবেচনায়’ ইউনিয়নের নির্বাচন আয়োজনের তাগিদ। এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই দেখছেন শৃঙ্খলাবিরোধী ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চাপ হিসেবে। একজন অভিজ্ঞ ট্রেড ইউনিয়ন কর্মকর্তা বলেন,
"এটা বিদ্বেষমূলক ও অনাহুত চাপ সৃষ্টির কৌশল।"
আরেকজন শ্রমিক সংগঠকের প্রশ্ন, "জাতীয় নির্বাচনের সময় ট্রেড ইউনিয়নের নির্বাচন হয় না। হঠাৎ সাত দিনের নির্দেশ-এর যুক্তি কোথায়?"
নীরবতার নেটওয়ার্ক
অভিযোগের পর অভিযোগ জমা পড়লেও, ফাইল নড়ে না, চিঠি পড়ে থাকে, তদন্ত হয় না, শাস্তি আসে না।
এই নীরবতাই ইঙ্গিত দেয়, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ভুল নয়; বরং একটি সুরক্ষিত নেটওয়ার্কের প্রতিফলন।
শেষ আশ্রয়: দুদক
সবশেষে সাধারণ লেবাররা দুদকের দ্বারস্থ হয়েছেন।
তাদের অভিযোগ, ক্ষমতার অপব্যবহার; ঘুষের বিনিময়ে পৌরসভা ভিত্তিক লেবার ইউনিয়ন নিবন্ধন; আর ইচ্ছাকৃতভাবে আইন লঙ্ঘন। এটি এখন শুধু শ্রমিকদের দাবি নয়, এটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।
শেষ প্রশ্ন
ট্রেড ইউনিয়ন কি শ্রমিকের ঢাল, নাকি কিছু মানুষের ব্যবসার অস্ত্র? যদি ইউনিয়নই শ্রমিককে বিভক্ত করে,
তবে সে ইউনিয়ন কি আদৌ শ্রমিকের? ফিরে আসি সেই চিঠিতে, "কিংকর্তব্যবিমূঢ়" শব্দটি এখন একক কোন ইউনিয়নের ভাষা নয়, এটি জলঢাকার শত শত লেবারের মানসিক অবস্থার এক প্রতিচ্ছবি।
এখন প্রশ্ন একটাই, আইন কি আবার আইনের জায়গায় ফিরবে, নাকি ইউনিয়নের নামে এই ছায়া রাজনীতি আরও গভীর হবে?
উত্তর লুকিয়ে আছে, তদন্তে, সাহসে এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর ইচ্ছায়।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক -শেখ তিতুমীর আকাশ।
বার্তা প্রধান : মোঃ সেলিম উদ্দিন
ইমেইল: dailyswadhinbhasha@gmail.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব www.swadhinbhasha.com কর্তৃক সংরক্ষিত।