লোকমান ফারুক | রংপুর
রংপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে থাকা টিনশেডের স্টাফ কোয়ার্টার, উন্মুক্ত মাঠ, গাছপালার সারি, বাইরে থেকে দেখলে পরিত্যক্তই মনে হয়। কিন্তু আগাছায় ঢাকা চারপাশ আর ভেতরে ঢুকলে দৃশ্য বদলে যায়। চুলায় ভাত বসে, উঠোনে ছাগল চরছে, আর একটি সরকারি কোয়ার্টার যেন ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যে রূপ নিয়েছে নীরবে, নির্বিঘ্নে।
এই কোয়ার্টারের বাসিন্দা মো. তৌহিদুল ইসলাম রংপুর সিভিল সার্জন অফিসের গাড়িচালক। প্রায় এক যুগ ধরে তিনি এখানে বিনা ভাড়ায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। শুধু তাই নয়, কোয়ার্টারের একটি অংশ সাবলেট দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। উঠোনে দেখা গেছে একপাশে চার-পাঁচটি ছাগল, অন্য পাশে আরও কয়েকটি—যা ঘিরে উঠেছে প্রশ্ন: সরকারি কোয়ার্টারে ব্যক্তিগত খামার কীভাবে?
তৌহিদুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভাই, আমি ড্রাইভার মানুষ। বিনা ভাড়ায় আছি—এটা অনেকের সহ্য হচ্ছে না। ছাগলের খামার ও সাবলেটের প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি মাঠের দিকে ইশারা করে বলেন, এটাকে কি কেউ খামার বলে? অফিসের মোটরবাইকটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন কি না এই প্রশ্নে তিনি নীরব থাকেন। সেই নীরবতা যেন শব্দের চেয়েও ভারী।
অফিস সূত্র জানায়, স্টাফ কোয়ার্টারটি কয়েক বছর আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। অথচ বিস্ময়করভাবে, গত অর্থবছরসহ তার আগের বছরগুলোতেও এই কোয়ার্টার সরকারি অর্থে সংস্কার করা হয়েছে। প্রশ্ন জাগে পরিত্যক্ত ভবনে কোন যুক্তিতে বরাদ্দ গেল? কে অনুমোদন দিল?
কোন ফাইলে সেই স্বাক্ষর? সূত্র আরও জানায়, বাসাটি বসবাসযোগ্য থাকা সত্ত্বেও পরিত্যক্ত ঘোষণার সুযোগে তৌহিদুল ইসলাম পরিবারসহ সেখানে ওঠেন। পরে আরেকজন স্টাফকেও সাবলেট দেন। পূর্বের কিছু কর্মকর্তাকে রাজি করিয়ে সরকারি অর্থে সংস্কার করানো হয়—এমন অভিযোগও রয়েছে।
এখানেই অনুসন্ধানের কাঁটা গভীরে ঢুকে যায়। একজন গাড়িচালক কীভাবে এক যুগ ধরে সরকারি কোয়ার্টার দখলে রাখেন? কীভাবে সাবলেট দেন? কীভাবে পরিত্যক্ত ঘোষিত ভবনে সংস্কারের টাকা আসে?
এ প্রশ্নগুলোর উত্তর একক কোনো ব্যক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সম্পর্কের চক্র—ফাইলের ভাঁজে ভাঁজে থাকা অনুমোদন, দপ্তরের নীরব সম্মতি, আর 'ড্রাইভার মানুষ' বলে এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি। এ যেন অদৃশ্য এক নেটওয়ার্ক—যেখানে ছোট পদ বড় ছায়া পায়, আর দায়িত্ব হারিয়ে যায় কাগজের ভিড়ে।
এ বিষয়ে বর্তমান সিভিল সার্জন ডা. শাহিন-এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "রিসেন্ট বিষয়টা আমি জেনেছি। আমি বিষয়টি দেখব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। এই বক্তব্যে প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু সময়রেখা নেই। ব্যবস্থা নেওয়ার আগে প্রশ্নগুলো ঝুলেই থাকে।
একটি নৈতিক প্রশ্ন, এটি কি কেবল একটি কোয়ার্টারের গল্প? নাকি সরকারি সম্পদ ব্যক্তিগত ব্যবহারের দীর্ঘদিনের এক নীরব নজির? পরিত্যক্ত ঘোষণার আড়ালে সংস্কার, বিনা ভাড়ায় বসবাসের সুবিধা,
সাবলেট ও ব্যক্তিগত খামার—সব মিলিয়ে প্রশ্ন একটাই:
সরকারি সম্পদ কি ক্ষমতার মানুষের কাছাকাছি থাকলেই ব্যক্তিগত হয়ে যায়?
দিনের শেষে স্টাফ কোয়ার্টারের মাঠের ছাগলগুলো আবার ঘরে ফেরে। বাইরে থেকে ভবনটি আবারও পরিত্যক্ত দেখায়। কিন্তু ভেতরে ক্ষমতার জীবন্ত চর্চা চলতেই থাকে। এই কোয়ার্টার শুধু ইট–সুরকির কাঠামো নয়—এটি প্রশাসনিক জবাবদিহির একটি পরীক্ষাগার।
দেখার বিষয়, প্রতিশ্রুত 'প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা' আদৌ নেওয়া হয় কি না, নাকি সবকিছু আবারও ফাইলের ভাঁজে হারিয়ে যায়।
পরিত্যক্ত ভবনের মতোই—সত্যও কি পরিত্যক্তই থেকে যাবে?
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক -শেখ তিতুমীর আকাশ।
বার্তা প্রধান : মোঃ সেলিম উদ্দিন
ইমেইল: dailyswadhinbhasha@gmail.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব www.swadhinbhasha.com কর্তৃক সংরক্ষিত।