লোকমান ফারুক, রংপুর
রংপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সিঁড়িগুলো তখনও ভিড়ের শব্দে মুখর। মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষ হয়েছে মাত্র।
কাগজের স্তূপ, সিলমোহর আর সরকারি নিয়মের গম্ভীরতার ভেতর হঠাৎ করেই উচ্চারিত হলো এক রাজনৈতিক অভিযোগ—যা শুধু একটি দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং গত দেড় দশকের ক্ষমতার ইতিহাসের বিরুদ্ধে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন জাতীয় পার্টিকে আখ্যা দিলেন 'ফ্যাসিবাদের দোসর' হিসেবে। তার কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ, কিন্তু ভাষা ছিল হিসাবি। তিনি দাবি তুললেন—"জাতীয় পার্টিকে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে।
'ফ্যাসিবাদ এক দিনে তৈরি হয়নি,' বলেন আখতার হোসেন। " একে বৈধতা দিয়েছে, টিকিয়ে রেখেছে, রক্ষা করার সব বন্দোবস্ত করেছে জাতীয় পার্টি।
তার মতে, "যারা স্বৈরাচারকে রাজনৈতিক অক্সিজেন জুগিয়েছে, তারা আবারও নির্বাচনী মাঠে ফিরলে সেটি হবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি—আর জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
তিনি আশঙ্কার কথাও উচ্চারণ করেন। "আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের চক্রান্ত চলছে—এমন ইঙ্গিত দিয়ে আখতার হোসেন বলেন, "আমরা কোনোভাবেই সেই রাজনীতি, সেই অংশগ্রহণ দেখতে চাই না। এই দাবি তিনি শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নয়, সরাসরি সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছেও তুলেছেন। কিন্তু অভিযোগের স্রোত থামেনি সেখানে।
আখতার হোসেন নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ও সমতার প্রশ্নও তোলেন। তার ভাষায়, "নির্বাচনী মাঠ এখনও অসমতল। কোথাও অর্থের ছড়াছড়ি, কোথাও পেশীশক্তির প্রদর্শন, কোথাও প্রশাসনের ভেতর থেকে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা। এসবের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনকে 'শক্ত অবস্থান' নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তার বক্তব্যে বারবার ফিরে আসে সহিংসতার স্মৃতি।
তফসিল ঘোষণার পরদিন ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা, তার আগে মানুষকে পাথর মেরে হত্যার ঘটনা—এসব উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, "দিন-দুপুরে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটছে। যদিও মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষদিনটি ছিল তুলনামূলকভাবে শান্ত।
আখতার হোসেনের কণ্ঠ তখন আরও ভারী হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, চব্বিশের অভ্যুত্থানে যারা জনগণের ওপর গুলি চালিয়েছিল, যারা মানুষ পিটিয়ে হত্যা করেছে—তারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিচার হয়নি, গ্রেপ্তার হয়নি। সেই অনিশ্চয়তার ভেতরেই ওসমান হাদির মতো পরিণতির আশঙ্কা ঘুরপাক খাচ্ছে।
" বুলেট প্রুফ গাড়ি দিয়েও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না, বলেন তিনি। 'অপরাধীরা যদি রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়।
তার কণ্ঠে তখন দৃঢ়তা—'আমরা বুলেট ভয় পাইনি। আমার ভাইয়েরা জীবন দিয়েছে। সত্যের পথ থেকে সরে আসবো না।
কিন্তু একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন—'নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। রাজনৈতিক সমীকরণ প্রসঙ্গে আখতার হোসেন জানান, 'সংস্কার বাস্তবায়ন, গণহত্যার বিচার দৃশ্যমান করা এবং দুর্নীতিমুক্ত ও আধিপত্যবাদমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে আট দলীয় জোট একত্রে নির্বাচনে যাচ্ছে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে, যা শিগগিরই চূড়ান্ত হবে।
এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনে আখতার হোসেনের প্রার্থিতা নিশ্চিত হয়েছে। জোটগত সমঝোতার কারণে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এটিএম আজম খান নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে তাকে সমর্থন জানিয়েছেন।
এই আসনের রাজনৈতিক ইতিহাস ভারী। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ জয় পেয়েছে ছয়বার, জাতীয় পার্টি চারবার এবং বিএনপি একবার।
বর্তমান নির্বাচনী চিত্রে, রংপুর-৪ আসনে দাখিল করা ১০ প্রার্থীর মধ্যে তিনজনের মনোনয়ন বাতিল করেছে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। বাতিল হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ্ আলম বাশার, মো. জয়নুল আবেদিন এবং জাতীয় পার্টির (আনিস–রুহুল) প্রার্থী মো. আব্দুস ছালাম।
বৈধ প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন বিএনপির মোহাম্মদ এমদাদুল হক ভরসা, সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) প্রগতি বর্মণ তমা, খেলাফত মজলিসের আবু সাহমা, এনসিপির আখতার হোসেন, বাংলাদেশ কংগ্রেসের উজ্জল চন্দ্র রায়, জাতীয় পার্টির আবু নাসের শাহ্ মো. মাহবুবার রহমান এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. জাহিদ হোসেন।
রংপুরের বিকেল তখন গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভিড় পাতলা হয়ে এসেছে। কিন্তু আখতার হোসেনের উচ্চারিত প্রশ্নগুলো—ফ্যাসিবাদ, বিচার, নিরাপত্তা আর রাজনৈতিক দায়—এখনও বাতাসে ঝুলে আছে।
নির্বাচনী মাঠে কে জিতবে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন থেকে যায়—বাংলাদেশ কি তার অতীতের সঙ্গে চূড়ান্ত হিসাব চুকাতে প্রস্তুত?
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক -শেখ তিতুমীর আকাশ।
বার্তা প্রধান : মোঃ সেলিম উদ্দিন
ইমেইল: dailyswadhinbhasha@gmail.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব www.swadhinbhasha.com কর্তৃক সংরক্ষিত।