নতুন পোশাকে মাঠে পুলিশ: রঙ বদলে কি বদলাবে আচরণ?

লোকমান ফারুক : বিশেষ প্রতিনিধি।
সকালের আলো ঠিক পুরোপুরি নেমে আসেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সেই পরিচিত মোড়ে ট্রাফিক সিগনালের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা দুই পুলিশ সদস্যকে দেখে পথচারীরা থমকে গেলেন একটু। নীল নয়, খয়েরি নয়—আজ তাদের গায়ে লৌহের মতো ধাতব-গাঢ় নতুন রঙ। যেন ধুলো-বালির শহরের বুকের ওপর নতুন এক অধ্যায়ের প্রথম দাগ।
নতুন পোশাকে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের দৃশ্যটিও ছিল ভিন্ন। বাতাসে হালকা শীত, ধাতব রঙের ইউনিফর্মে সকালের আলো লেগে অদ্ভুত এক ঝলক তৈরি করছিল। মুহূর্তটিতে মনে হচ্ছিল—এ শুধু পোশাক পরিবর্তন নয়, যেন কোনো দীর্ঘদিনের জমে থাকা প্রত্যাশার দরজায় নতুন কড়াঘাত।
পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় পুলিশের আচরণকে ঘিরে উদ্ভূত তীব্র সমালোচনা দেশজুড়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল—পোশাক বদলালে কি বদলাবে মন? সেই প্রশ্নের মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগের প্রথম দৃশ্যমান সিগন্যাল হিসেবে প্রকাশ পায় এই নতুন ইউনিফর্ম।
শনিবার (১৫ নভেম্বর) সকাল থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)—সঙ্গে দেশের সব মহানগর, পিবিআই, ট্যুরিস্ট পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও নৌ পুলিশ পরল নতুন লৌহ-রঙের পোশাক। জেলা ও রেঞ্জ পর্যায়ে এখনো পৌঁছায়নি; তবে পুলিশের সদর দপ্তর বলছে, দ্রুতই পৌঁছাবে।
ডিএমপি’র মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বললেন,
"আজ থেকেই মহানগরগুলোতে নতুন পোশাক কার্যকর। জেলা পর্যায়েও খুব দ্রুত বাস্তবায়ন হবে।"
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, 'জেলা ও রেঞ্জ পুলিশও শিগগিরই যুক্ত হবে। তবে এপিবিএন ও এসপিবিএন আপাতত তাদের আগের পোশাকেই থাকবে।'
এর আগেই স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছিলেন—র্যাব, পুলিশ ও আনসারের জন্য নতুন পোশাক অনুমোদিত হয়েছে এবং ধাপে ধাপে প্রয়োগ করা হবে।
ঘটনাস্থলে দেখা আলাদা এক সকাল।
ঢাকার বেইলি রোড—যেখানে প্রতিদিন সকাল মানেই অফিসগামী মানুষের তাড়াহুড়া, গাড়ির হর্ন, ধুলোর ভিড়। আজ যেন সেই চেনা দৃশ্য খানিক পাল্টে গেছে। নতুন পোশাক পরা এক নৌ পুলিশ সদস্য যখন পথচারীদের রাস্তা পার হতে সাহায্য করছিলেন, আশেপাশে দাঁড়ানো কৌতূহলী চোখে স্পষ্ট ছিল—দৃশ্যটি শুধু নতুনত্ব নয়, এক ধরনের নীরব প্রশ্নও বটে।
এক রিকশাওয়ালা এগিয়ে এসে বললেন, 'পোশাক নতুন হইছে ঠিক, কিন্তু আচরণ কি নতুন হইব?' পাশে দাঁড়ানো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বললেন, 'দেখতে ভালো লাগছে। কিন্তু আমরা চাই পুলিশের মানসিকতার পরিবর্তন—ভয় নয়, আস্থা।' শহরের কোলাহলে ভেসে আসা এমন স্বরগুলোই যেন আজকের এই পোশাক পরিবর্তনের অন্তর্নিহিত প্রেক্ষাপট।
সংস্কারের পদক্ষেপ: দৃশ্যমান না অদৃশ্য?
অন্তর্বর্তী সরকার জানাচ্ছে—এটি শুধুই পোশাক পাল্টানোর বিষয় নয়। পুলিশের মানসিকতা, আচরণ, জবাবদিহি ও দায়িত্ব পালনের ধরনকে বদলে দিতে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ক্রমান্বয়ে পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক, দক্ষ ও জনবান্ধব করার পরিকল্পনারও অংশ এটি।
পোশাকের লৌহ রঙ—ধাতুর মতো ঠান্ডা, শৃঙ্খলার মতো কঠোর। কিন্তু মানুষ আশা করে পুলিশ হবে আশ্বাসের ছায়া, পাহারাদারের নিঃশব্দ হাত। রঙ বদলে সেই হাত নরম হবে নাকি আরও কঠোর—এ প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।
শেষের দৃশ্য: প্রশ্নের প্রতিধ্বনি।
বিকেলের দিকে কারওয়ান বাজার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক পুলিশ সদস্যকে দেখে মনে হচ্ছিল—শহর যেন তাকে নতুন চোখে দেখছে। রোদে পোশাকের ধাতব রঙ ঝিলমিল করে উঠছিল। রাস্তার ধুলোয় সেই রঙ বড় অদ্ভুতভাবে মিলেমিশে যাচ্ছিল। দুপুর থেকে রাত—দিনভর নতুন পোশাকে দায়িত্ব পালনকারীদের দেখে একটি জিনিস পরিষ্কার—দৃশ্য পাল্টেছে। কিন্তু আচরণ পাল্টাবে কি?
সত্য যেন বাতাসে ভাসতে থাকে—পোশাক পরিবর্তন সহজ; আচরণ পরিবর্তন কঠিন। শহর অপেক্ষায়—ধৈর্য নিয়ে, সংশয় নিয়ে, আবার আশাও নিয়ে। যে পোশাক আজ মাঠে এসেছে, তা কি নতুন আচরণের প্রতীক হয়ে উঠবে? নাকি রঙ ঝরে যাবে প্রথম বৃষ্টিতেই?
শুরু যেমন ছিল নতুন রঙের ঝলকে—শেষও তেমনই একটি প্রশ্নের আলোয়—রঙ বদলে কি বদলাবে মন?